কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:
সংসারের অভাব দূর করবেন, ধারদেনা শোধ করবেন—স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে একটু স্বচ্ছল জীবন কাটাবেন, এমন স্বপ্ন নিয়েই প্রায় দেড় বছর আগে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের ভৈরবের জাকির হোসেন। সেখানে চাকরিও জুটেছিল। পরিবারের ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি নিয়মিত বাড়িতে টাকা পাঠাচ্ছিলেন তিনি। সম্প্রতি চাকরিতে পদোন্নতিও হয়েছিল। সব মিলিয়ে পরিবারে ফিরেছিল স্বস্তি, দেখা দিয়েছিল নতুন আশার আলো।
কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। রাশিয়ার আমুর অঞ্চলের একটি গ্যাস কেমিকেল কমপ্লেক্সে গ্যাস লিকেজ থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছেন জাকির হোসেন।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সন্ধ্যায় তার মৃত্যুর খবর ভৈরবের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাসন্তানসহ পুরো পরিবার এখন দিশেহারা।
জাকির হোসেন কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আতকাপাড়া গ্রামের মৃত রতন মিয়ার বড় ছেলে। স্ত্রী ও এক কন্যাসন্তানকে নিয়ে ছিল তার সংসার।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দেশে থাকাকালে রিকশা চালানোসহ বিভিন্ন কাজ করতেন জাকির। কিন্তু এসব কাজের আয় দিয়ে সংসারের অভাব দূর হচ্ছিল না। পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের আশায় জমিজমা বিক্রি এবং ধারদেনা করে প্রায় দেড় বছর আগে রাশিয়ায় পাড়ি জমান তিনি।
রাশিয়ার আমুর অঞ্চলে এলএনজি সিনোপেক ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপের অধীন একটি গ্যাস কমপ্লেক্সে চাকরি নেন জাকির। সেখানে কাজ করে পরিবারের খরচ চালানোর পাশাপাশি বিদেশ যাওয়ার সময় নেওয়া ঋণও ধীরে ধীরে পরিশোধ করছিলেন। সম্প্রতি চাকরিতে পদোন্নতি পাওয়ায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল।
স্বজনরা জানান, এরই মধ্যে কয়েক দিন আগে ওই গ্যাস কমপ্লেক্সে গ্যাস লিকেজ থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে জাকির নিহত হন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তার মৃত্যুর খবর বাড়িতে পৌঁছালে মুহূর্তেই আনন্দের পরিবেশ পরিণত হয় শোকে।
জাকিরের চাচাতো ভাই মাহবুবুর রহমান বলেন, জাকিরের পরিবার অত্যন্ত অসহায় ও অস্বচ্ছল। দেশে রিকশা চালানোসহ বিভিন্ন কাজ করে সংসার চালাতেন তিনি। পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের আশায় জমিজমা বিক্রি ও ঋণ করে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। সেখানে চাকরি করে ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি পরিবারকে স্বচ্ছল করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুতে পরিবারটি একদিকে উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়েছে, অন্যদিকে মাথার ওপর রয়ে গেছে ঋণের বোঝা।
তিনি আরও বলেন, জাকিরের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশীদ বলেন, রাশিয়ায় গ্যাস বিস্ফোরণে জাকির হোসেনের মৃত্যুর খবর তারা পেয়েছেন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে পরিবারটির আর্থিক অসচ্ছলতার বিষয়টিও জানা গেছে।
ইউএনও বলেন, জাকিরের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনাই এখন তাদের প্রথম অগ্রাধিকার। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। পাশাপাশি অসহায় পরিবারটি যাতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা পায়, সে বিষয়েও সহযোগিতা করা হবে।