স্টাফ রিপোর্টার:
চট্টগ্রাম মেট্রো-২ সার্কেলের বায়েজিদ বালুচরা কার্যালয়ে অনিয়ম, দালালনির্ভরতা ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. সানাউল হক এবং জেলা সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. সলিম উল্যাহ। ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সরকারি নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দালালের মাধ্যমে দ্রুত ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেস, রুট পারমিট, রেজিস্ট্রেশনসহ বিভিন্ন সেবা পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক সেবাপ্রার্থীর ভাষ্য, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ফি পরিশোধের পর আবেদন জমা দিলেও অনেক ক্ষেত্রে ফাইল দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট শাখায় বারবার যোগাযোগ করেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার অভিযোগ করেছেন তারা। তবে একই সেবা দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে করাতে গেলে তুলনামূলক দ্রুত কাজ সম্পন্ন হওয়ার সুযোগ তৈরি হয় বলে দাবি তাদের। এ কারণে কার্যালয়টিতে একটি দালালনির্ভর সেবা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগীদের কয়েকজনের অভিযোগ, এসব কার্যক্রমের পেছনে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। ওই সিন্ডিকেটের সঙ্গে সানাউল হক ও সলিম উল্যাহর সম্পৃক্ততার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন সেবাপ্রার্থী। তবে এ অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথি, লেনদেনের তথ্য, আবেদন প্রক্রিয়ার রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেস, রুট পারমিট, মালিকানা পরিবর্তন ও রেজিস্ট্রেশনসহ বিভিন্ন সেবা নিতে সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। বিশেষ করে পরীক্ষা ছাড়াই ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং যথাযথভাবে যানবাহন পরিদর্শন না করেই ফিটনেস সনদ দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্যে আরও কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বহিরাগত ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে সহকারী মোটরযান পরিদর্শক আব্দুল মতিন, জেলা রেজিস্ট্রেশন শাখার টিপু সুলতান, অফিস সহকারী-পিয়ন খোরশেদ আলম, নৈশপ্রহরী লিটন এবং বহিরাগত হিসেবে পরিচিত রুবেলের নাম উল্লেখ করেছেন কয়েকজন সেবাপ্রার্থী। তাদের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্রেশন, মালিকানা পরিবর্তনসহ বিভিন্ন সেবা প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
কয়েকজন সেবাপ্রার্থী নৈশপ্রহরী লিটনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, অস্থায়ী কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তিনি কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কিছু কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করেন। এমনকি ভুয়া কাগজপত্র তৈরির সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রয়োজনীয় নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সেবাপ্রার্থীদের কয়েকজনের দাবি, বিভিন্ন সেবার জন্য কার্যালয়কেন্দ্রিক একটি অলিখিত রেট নির্ধারণ করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, পরীক্ষা ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স করে দেওয়ার নামে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। আবার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আবেদন করলেও অতিরিক্ত ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের ফিটনেস ও রুট পারমিটের ক্ষেত্রেও কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন তারা। তবে এসব অর্থ লেনদেনের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য ও নথি প্রয়োজন।
অক্সিজেন এলাকার লেগুনা চালক মহিদুল এবং অলংকার এলাকার সিএনজি চালক স্বপনসহ কয়েকজন ভুক্তভোগীর অভিযোগ, বৈধ প্রক্রিয়ায় আবেদন করার পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেক সময় কাজ শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের দাবি, কার্যালয়ের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় কাজ এগিয়ে নিতে না পারলেও দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করলে দ্রুত সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যায়। এতে সরকারি নির্ধারিত নিয়ম মেনে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ তাদের।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দালালদের একটি অংশ কার্যালয়ের ভেতরের বিভিন্ন শাখায় নিয়মিত যাতায়াত ও যোগাযোগ রক্ষা করে। সেবাপ্রার্থীদের অনেককে তারা দ্রুত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে সরকারি সেবা গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনভিজ্ঞ কিংবা জরুরি প্রয়োজনে আসা সাধারণ মানুষ দালালের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এদিকে সানাউল হককে ঘিরে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে বিআরটিএ সিলেট ও ঢাকার মিরপুর কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে তাঁকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ এবং সিলেটে পরিবহন শ্রমিকদের আন্দোলনের বিষয়টিও সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে পূর্বের এসব অভিযোগের প্রকৃত অবস্থা ও নিষ্পত্তির বিষয়ে নির্ভরযোগ্য নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম মেট্রো-২ সার্কারে বর্তমানে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. সানাউল হকের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্ন পাঠানো হয়। কিন্তু প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একইভাবে জেলা সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. সলিম উল্যাহর হোয়াটসঅ্যাপেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রশ্ন পাঠানো হয়। তিনিও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব দেননি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সময়ে প্রকাশ করা হবে।
সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগগুলোর মধ্যে পরীক্ষা ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং যথাযথ যান্ত্রিক পরিদর্শন ছাড়া ফিটনেস সনদ দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দক্ষতা যাচাই ছাড়াই কোনো চালককে লাইসেন্স দেওয়া হলে সড়কে অদক্ষ চালকের চলাচলের ঝুঁকি বাড়তে পারে। একইভাবে যানবাহনের প্রকৃত অবস্থা যাচাই না করে ফিটনেস সনদ দেওয়া হলে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন সড়কে চলাচলের সুযোগ পেতে পারে। ফলে অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রাম মেট্রো-২ সার্কারে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে বিআরটিএর অভ্যন্তরীণ তদন্তের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত করা যেতে পারে। সরকারি ফি পরিশোধের পর কোনো সেবাপ্রার্থী কেন নির্ধারিত সময়ে সেবা পাচ্ছেন না, কোন পর্যায়ে আবেদন বা ফাইল আটকে থাকছে, অতিরিক্ত অর্থের অভিযোগের সঙ্গে কারা জড়িত এবং দালালদের সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব বিষয় নথি, আবেদন রেকর্ড ও তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
তাদের দাবি, সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধ করতে আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা কঠোরভাবে অনুসরণ, দালালদের প্রবেশ ও প্রভাব নিয়ন্ত্রণ, সরকারি ফি ও সেবার নির্ধারিত সময় প্রকাশ্যে প্রদর্শন এবং অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।