আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের কারণে কিছুদিন অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও দেশে নন-ইউরিয়া সার আমদানির প্রক্রিয়া আবারও গতি পেয়েছে। রবি ও বোরো মৌসুমের আগে সরবরাহ ও মজুদ বাড়াতে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি), মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) ও ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) নিয়ে সাতটি জাহাজ দেশে আসছে।
দেশের পথে থাকা সাতটি জাহাজের মধ্যে একটি ডিএপি, চারটি এমওপি এবং দুটি টিএসপি বহন করছে। এসব জাহাজে মোট আড়াই লাখ টন সার আসছে। এর মধ্যে রয়েছে ৪০ হাজার টন ডিএপি, ১ লাখ ৫০ হাজার টন এমওপি এবং ৬০ হাজার টন টিএসপি। আগামী অক্টোবরেও এসব সার নিয়ে প্রায় ১০টি জাহাজ দেশে আসার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, চলতি মাসে টিএসপি বহনকারী দুটি জাহাজ দেশে আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে একটি ৮ সেপ্টেম্বর এবং অপরটি ১১ সেপ্টেম্বর পৌঁছাতে পারে। জাহাজ দুটিতে মোট ৬০ হাজার টন টিএসপি রয়েছে, যা মরক্কো থেকে আমদানি করা হচ্ছে। একই দেশ থেকে ৪০ হাজার টন ডিএপি নিয়ে আরও একটি জাহাজ ৮ সেপ্টেম্বর দেশের বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এ ছাড়া চলতি মাসে মোট ১ লাখ ৫০ হাজার টন এমওপি দেশে আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে রাশিয়া থেকে ৩৫ হাজার টন করে দুটি লটে মোট ৭০ হাজার টন এবং কানাডা থেকে ৪০ হাজার টন করে দুটি লটে মোট ৮০ হাজার টন এমওপি আমদানি করা হচ্ছে। চারটি চালানের মধ্যে দুটি চলতি সপ্তাহে এবং বাকি দুটি যথাক্রমে ১৩ ও ১৫ সেপ্টেম্বর দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বিএডিসির হিসাব অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বর থেকে আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পিক মৌসুমে দেশে ডিএপির চাহিদা হবে ১১ লাখ ২৭ হাজার টন। বর্তমানে জাহাজে থাকা সারসহ আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি প্রক্রিয়াধীন ও আলোচনাধীন ডিএপির পরিমাণ ৬ লাখ ৮০ হাজার টন।
একই সময়ে এমওপির চাহিদা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৭২ হাজার টন। চলতি মাসে দেশে আসার অপেক্ষায় থাকা চালানসহ আমদানি প্রক্রিয়াধীন ও আলোচনাধীন এমওপির পরিমাণ ৬ লাখ ৮০ হাজার টন।
অন্যদিকে, পিক মৌসুমে টিএসপির চাহিদা হবে ৫ লাখ ১৯ হাজার টন। এর বিপরীতে চূড়ান্ত আমদানি প্রক্রিয়ায় থাকা এবং সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির আওতায় আলোচনাধীন টিএসপির পরিমাণ ৩ লাখ ৬০ হাজার টন।
সেপ্টেম্বরে সাতটি জাহাজে সার আসার পর আগামী অক্টোবরেও ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি নিয়ে প্রায় ১০টি জাহাজ দেশে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব চালানের আমদানি প্রক্রিয়া বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
বিএডিসির সার আমদানি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতি মাসে ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি নিয়ে ১০ থেকে ১২টি করে জাহাজ দেশে আসবে। সেপ্টেম্বরের চালানগুলো ইতোমধ্যে দেশের পথে রয়েছে। অক্টোবরের চালানগুলোর মধ্যে কয়েকটির লোডিং শেষ হয়েছে, আর কয়েকটি এখনো লোডিং পর্যায়ে রয়েছে। পরবর্তী মাসগুলোর চালানের ঋণপত্র (এলসি) দ্রুত খোলা হবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, অক্টোবরের শেষ দিক থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশে সারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময়ে শীতকালীন সবজি, আলু, পেঁয়াজ ও ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হয়। পাশাপাশি দেশের প্রধান খাদ্যশস্য বোরো ধানের আবাদও শুরু হয়। ফলে বছরের মোট সারের চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশই এই শীতকালীন মৌসুমে হয়ে থাকে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সামনে রবি ও বোরো মৌসুম। বর্তমানে যে পরিমাণ সার আমদানি হচ্ছে, তা চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে সামনের মৌসুমে সারের চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকবে। তাই এখন থেকেই সরবরাহ ও মজুদ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শুধু আমদানির ওপর নির্ভর না করে দেশীয় কারখানাগুলোতেও উৎপাদন বাড়ানো জরুরি।
এদিকে আমন মৌসুমকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকরা বেশ কিছুদিন ধরে সার না পাওয়ার অভিযোগ করে আসছেন। ডিলারের কাছে সার না পাওয়া এবং বাড়তি দামে সার কিনতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এর মধ্যে কুড়িগ্রামে ডিলারের গুদাম ভেঙে কৃষকদের সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এ ঘটনার পর কৃষি মন্ত্রণালয় কঠোর অবস্থান নেয় এবং দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে কয়েকজন কৃষি কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। তবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হচ্ছে, দেশে সারের কোনো সংকট নেই।
সার আমদানি নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, সার আমদানি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রতি মাসের চাহিদার হিসাব অনুযায়ী কোনো মাসে বেশি, কোনো মাসে কম সার আমদানি করা হয়। বছরে দেশে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখ টন সার আমদানি করতে হয়।
তিনি বলেন, এত সার একসঙ্গে আনা সম্ভব নয়, আবার দীর্ঘদিন রাখার মতো পর্যাপ্ত গুদামও নেই। দীর্ঘদিন গুদামে রাখলে সারের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই চাহিদা অনুযায়ী সার আমদানি করে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সৌদি আরব ও কাতার থেকে কিছুদিন সার আমদানি বন্ধ থাকলেও পরে বিকল্প পথে সরবরাহ শুরু হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, তারাও এখন হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সার আমদানি করছেন। ফলে সার আমদানি নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই।