স্ত্রীকে নিয়ে ঈদে গ্রামে যাওয়ার স্বপ্ন, বাড়ি ফিরলো রানার নিথর দেহ

মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:

মাত্র চার মাস আগে বিয়ে করেছিলেন ২২ বছর বয়সী পোশাক শ্রমিক মো. রানা। আসন্ন ঈদুল আজহায় স্ত্রীকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। নতুন সংসারে একটু স্বস্তি আনতে বাড়তি আয়ের আশায় কারখানার ছুটির দিনেও নির্মাণ শ্রমিকের কাজে নেমেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে উঠলো জীবনের শেষ পথচলা—কাজ শেষে আর বাড়ি ফেরা হলো না রানার।

শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) দুপুরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ভোলাইল গেদ্দারবাজার এলাকায় নির্মাণাধীন একটি ভবনের পানির ট্যাংকের ভেতরে নেমে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান রানা। তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে একই পরিণতি বরণ করেন তার সহকর্মী দেলোয়ার মৃধা।

নিহত রানা গাইবান্ধার পলাশবাড়ি উপজেলার মৃত আব্দুর রহিমের ছেলে। অন্যদিকে দেলোয়ার মৃধা পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ভাংরা গ্রামের আলতাফ মৃধার সন্তান। দেলোয়ার পেশায় রাজমিস্ত্রী ছিলেন, আর রানা কাজ করতেন একটি পোশাক কারখানায়। ছুটির দিন হওয়ায় অতিরিক্ত উপার্জনের জন্য দেলোয়ারের সঙ্গে রাজমিস্ত্রীর কাজে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কাজ করার সময় পানির ট্যাংকের ভেতরে ঢুকে অচেতন হয়ে পড়েন দুই শ্রমিক। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ট্যাংকের ভেতর থেকে তাদের উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে পাঠান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শাহাদাত হোসেন জানান, হাসপাতালে আনার আগেই তাদের মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ট্যাংকের ভেতরে অক্সিজেনের অভাবে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে।

রানা ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। গাইবান্ধার বাড়িতে তার তিন বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। জীবিকার তাগিদে তিনি নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম দেওভোগ এলাকার নূর মসজিদ সংলগ্ন একটি টিনশেড বাসায় স্ত্রী জান্নাতি বেগম ও মা রাশেদা বেগমকে নিয়ে বসবাস করতেন।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে ছেলের মরদেহ দেখে আহাজারিতে ভেঙে পড়েন মা রাশেদা বেগম ও নববধূ স্ত্রী জান্নাতি। হৃদয়বিদারক সেই দৃশ্যে উপস্থিত সবার চোখে পানি এসে যায়।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রাশেদা বেগম বলেন, “আমার ছেলে চার মাস আগে বিয়ে করছে। বউ এখনও বাড়ি দেখে নাই। গ্রামের সবাই অপেক্ষা করতেছিল। এই ঈদে বাড়ি নিয়ে যাইবো কইছিল। আমারে কইলো—‘আম্মু, আমি কামে যাই, টাকা দরকার।’ ও বাবা, তুমি আমারে ফেলে কই গেলা?”

স্ত্রী জান্নাতি বেগমও স্বামীর মরদেহ জড়িয়ে ধরে বিলাপ করতে থাকেন। তিনি বলেন, “আল্লাহ, আমারে ওর সাথে নিয়ে যাও। আমাকেও ওর সাথে দাফন করেন।”

একটি পরিবারের একমাত্র অবলম্বন হারানোর বেদনায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন স্বজনরা। রানার মৃত্যুতে তার গ্রামের বাড়িতেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। যে ছেলে ঈদে বাড়ি ফিরবে বলে অপেক্ষায় ছিল পরিবার, সেই ছেলে ফিরছে নিথর দেহ হয়ে—এক অমোচনীয় শোকগাথা রেখে।

এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে শোকের পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্মাণাধীন স্থাপনায় কাজ করার সময় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও গ্যাস পরীক্ষা নিশ্চিত করা হলে এমন দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

রানা ও দেলোয়ারের মৃত্যু আবারও স্মরণ করিয়ে দিল—জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন কতটা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন শ্রমজীবী মানুষ, আর সামান্য অবহেলাই কিভাবে কেড়ে নিতে পারে তাজা দুটি প্রাণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *