হাসিনা ইস্যুতে ওয়াশিংটনের বার্তা, নতুন চাপে দিল্লি

অনলাইন ডেস্ক:

শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের বর্তমান গতিপথ।

সম্প্রতি নিউইয়র্কে দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক অন-ব্যাকগ্রাউন্ড ব্রিফিংয়ে শেখ হাসিনা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তুলে ধরা হয়। সেখানে একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ওয়াশিংটন এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারত নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বিষয়টির একটি সমাধানে পৌঁছাবে—এমন প্রত্যাশার কথাও জানানো হয়।

মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার বিষয়টি বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের কারণ হয়ে উঠেছে। তবে তাঁর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট কোনো অবস্থান নেয়নি। অর্থাৎ ওয়াশিংটনের প্রকাশ্য বক্তব্যকে শেখ হাসিনার পক্ষে বা বিপক্ষে সরাসরি অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত।

একই ব্রিফিংয়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর থাকা বিধিনিষেধ নিয়েও প্রশ্ন করা হলে মার্কিন কর্মকর্তা বিষয়টিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে চায়।

এখানেই বর্তমান কূটনৈতিক সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে ফেরত পাঠানোর বাংলাদেশের দাবি ইতোমধ্যে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছে এবং ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি বিদ্যমান আইনগত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হচ্ছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছিলেন, ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ও অন্য অভিযুক্তদের ফেরত দেওয়া দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক বক্তব্যে বাংলাদেশকে চীন বা ভারতের মধ্যে কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার নীতি প্রত্যাখ্যান করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অবকাঠামো ও টেলিযোগাযোগের মতো সংবেদনশীল খাতে বিকল্প অংশীদারিত্বের সুযোগ তৈরি এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিস্থাপকতা জোরদারের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে দিল্লির সামনে মূল প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কোন কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো হবে। শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিদ্যমান বিরোধ একদিকে যেমন দুই দেশের সম্পর্কে চাপ তৈরি করছে, অন্যদিকে অর্থনীতি, বাণিজ্য, সীমান্ত, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক যোগাযোগের মতো বিষয়গুলোও দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।

বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বিভিন্ন পর্যায়ে উঠে আসছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশ থেকেই কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। একই সময়ে বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের নিয়োগের খবরও দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার সঙ্গে আলোচিত হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অবস্থানেও একটি বিষয় স্পষ্ট—ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দাবি করছে না। বরং নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহের কথা জানিয়েছে এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রমসংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে।

ফলে শেখ হাসিনা ইস্যুটি এখন শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর কূটনৈতিক সমীকরণের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে।

সামনের দিনে ঢাকা ও দিল্লির আলোচনায় প্রত্যর্পণ ইস্যু, দ্বিপক্ষীয় আইনগত কাঠামো এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থানও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটন এ বিষয়ে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার বদলে বাংলাদেশ ও ভারতকে নিজেদের মধ্যে সমাধান খুঁজে নেওয়ার প্রত্যাশা করছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য যেমন নিজের জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারতের জন্যও বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়াই বর্তমান নীতির অন্যতম প্রকাশ্য দিক।

শেখ হাসিনা ইস্যুতে শেষ পর্যন্ত ঢাকা ও দিল্লি কী ধরনের সমঝোতায় পৌঁছায়, সেটিই এখন আঞ্চলিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *