১০ কোটি টাকা বিল তুলে উধাও ঠিকাদার, ছয় বছরেও শেষ হয়নি সেতু নির্মাণ

মোঃ মশিউর রহমান:

ঠিকাদারের দায়িত্বহীনতা, কাজে গাফিলতি ও প্রতারণার কারণে টাঙ্গাইলের নিউ ধলেশ্বরী নদীর ওপর কালিহাতী উপজেলার জোকারচরে নির্মাণাধীন সেতুর কাজ দীর্ঘদিন ধরে মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে। সামান্য একটু কাজ করেই প্রায় ১০ কোটি টাকা নিয়ে পালিয়েছে ঠিকাদার। ছয় বছরে মাত্র তিনটি পিলারে আটকে আছে সেতু নির্মাণ। এতে দুটি উপজেলার লাখ লাখ মানুষকে যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। মুখ থুবড়ে পড়েছে যমুনা সেতু-ঢাকা মহাসড়কের বিকল্প পথ।

টাঙ্গাইল এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার পশ্চিমে চরাঞ্চলের মাহমুদ নগরের গোল চত্বর থেকে যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্তে মহাসড়ক পর্যন্ত সড়ক নির্মিত হয়েছে। জোকারচরে নিউ ধলেশ্বরী নদীর ওপর সেতু নির্মিত হলে যমুনা সেতু-ঢাকা মহাসড়কের বিকল্প পথ তৈরি হবে। এ লক্ষ্যে জোকারচরে ধলেশ্বরী নদীর ওপর সেতু নির্মাণে এলজিইডি ৩৪ কোটি ১৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ব্যয়ে ২৬৪ মিটার পিএসসি গার্ডার সেতু নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করে। হায়দার কনস্ট্রাকশন প্রাইভেট লিমিটেড, অবনী এন্টারপ্রাইজ ও সৈয়দ মজিবুর রহমান নামক তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জয়েন্টভেঞ্চারে সেতু নির্মাণের কাজ পায়। ২০২০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তাদের কার্যাদেশ (ওয়ার্ক অর্ডার) দেওয়া হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, জোকারচরে নিউ ধলেশ্বরী নদীর বাম তীরে দুটি ও ডান তীরে একটি পিলার নির্মাণ করেই মূল ঠিকাদার মো. হেকমত আলী এলজিইডি থেকে ৯ কোটি ৮১ লাখ ৪২ হাজার ৭৪৩ টাকা বিল উঠিয়ে নিয়েছেন। এলাকাবাসী জানায়, একেক সময় একেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন সাইটে আসে, মাপ-ঝোঁক করে, ইট-রড আনে, আবার চলে যায়। তারা জানেই না সেতু নির্মাণের মূল ঠিকাদার কে?

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এলজিইডির চুক্তি অনুযায়ী ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করার কথা। কিন্তু অংশীদারদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি, মতপার্থক্য ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হওয়ায় দেড় বছরে তারা কাজই শুরু করেনি। কার্যাদেশ পাওয়ার দেড় বছর পর জয়েন্টভেঞ্চারের এক অংশীদার সৈয়দ মজিবুর রহমান সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু করেন। ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে তিনি ওই সেতুতে তিন কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন।

হঠাৎ করে অপর এক অংশীদার অবনী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী হেকমত আলী সেই কাজ বন্ধ করে দেন বলে অভিযোগ করেন সৈয়দ মজিবুর রহমান। এসব ঘটনায় সেতুর নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে। সৈয়দ মজিবুর রহমান টাকা ফেরত চেয়ে প্রশাসনসহ বিভিন্ন স্থানে চিঠি দেন। তাদের মধ্যে মামলা, পাল্টা মামলা হয়। মো. হেকমত আলী অপর দুই ঠিকাদার হায়দার ও সৈয়দ মজিবুর রহমানের স্বাক্ষর জাল করে গাজীপুরের এক ঠিকাদার রফিকুল ইসলামের কাছে কাজটি বিক্রি করে দেন।

জয়েন্টভেঞ্চারের অংশীদার সৈয়দ মজিবুর রহমান বলেন, দুই অংশীদার হেকমত ও হায়দার কাজ করবেন না বলে আমাকে স্ট্যাম্পে লিখে দিয়ে সেতুটি নির্মাণ করার দায়িত্ব দেন। ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে আমি সেখানে তিন কোটি টাকা বিনিয়োগ করি। হঠাৎ করে এক অংশীদার হেকমত সন্ত্রাসী বাহিনী এনে আমার কাজ বন্ধ করে দেন। সেতু তিনি নির্মাণ করবেন বলে জানান।

গাজীপুরের ঠিকাদার রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, হেকমত আলী তার সঙ্গে প্রতারণা করছেন। তিনি পাইলিংসহ ওই সেতু নির্মাণে দুই কোটি ৫৮ লাখ টাকা হেকমতকে দিয়েছেন। জাল স্বাক্ষরের বিষয়টি জানতে পেরে তিনি এর প্রতিবাদ করলে তাকে এলেঙ্গা রিসোর্টে আটকিয়ে সব চুক্তিপত্র ফেরত নেন। তার কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত তিনি কোনো টাকা ফেরত পাননি।

এদিকে হেকমত সেতুর তিনটি পিলার নির্মাণ করেই ৯ কোটি ৮১ লাখ ৪২ হাজার ৭৪৩ টাকা বিল উঠিয়ে নেন। ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর হেকমত আলী আত্মগোপনে চলে যান। বন্ধ হয়ে যায় অতিগুরুত্বপূর্ণ সেতুর নির্মাণকাজ।

এদিকে জনগণের যাতায়াতে ভোগান্তির কথা মাথায় রেখে এলজিইডি কর্তৃপক্ষ চলতি বছরের ৯ মার্চ জোকারচরে ওই সেতুর নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে। দরপত্রে প্রাক্কলিত মূল্য ধরা হয় ৩৪ কোটি ৪৪ লাখ ৫৩ হাজার ৩৭৯ টাকা। নির্মাণের কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চৌধুরী-এলহোজ জয়েন্টভেঞ্চার (জেভি)। তাদের আগামী ২২ মাসের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার কথা রয়েছে।

জোকারচর গ্রামের ইউনুস শেখ, বিদ্যুৎ মিয়া, জাহাঙ্গীর হোসেন, মাসুদ রানা জানান, সেতুটি মূলত যমুনা সেতু-ঢাকা মহাসড়কের বিকল্প পথের সেতুবন্ধন। সেতুটি নির্মিত হলে যমুনা সেতু-ঢাকা মহাসড়কের বিকল্প পথ তৈরি হবে। টাঙ্গাইল শহরসহ পশ্চিম-দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ সহজেই এই সেতু দিয়ে উত্তরাঞ্চলে যেতে পারবে। এতে প্রতি ঈদে মহাসড়কে যানজটও হবে না। বিকল্প পথ দিয়ে এলেঙ্গা যেতে পারবে। জনগণের ভোগান্তি লাঘবের জন্য সেতুটির নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

টাঙ্গাইল এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানার পারভীন জানান, ঠিকাদারদের একে অপরের মধ্যে মিল না থাকা ও তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে যথাসময়ে কাজ শেষ হয়নি। তবে তারা যতটুকু কাজ করেছিল, তার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদারও নির্বাচন করা হয়েছে। এবার নির্দিষ্ট সময়েই সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *