আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ভারতের শিল্পপতি মুকেশ আম্বানির ছেলে অনন্ত আম্বানিকে টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে ‘প্রফেসরশিপ অব প্র্যাকটিস’ দিয়েছে যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য, প্রাণী কল্যাণ ও পরিবেশ রক্ষায় তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এই পদ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
তবে অনন্ত আম্বানির নেতৃত্বে গুজরাটে পরিচালিত বন্য প্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণকেন্দ্র ‘ভান্তারা’ নিয়ে আগে থেকেই বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে অনন্তকে অধ্যাপক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিবেশবিদ, সংরক্ষণকর্মী ও একাডেমিকদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন।
অনন্ত আম্বানি মুকেশ আম্বানির ছেলে এবং রিলায়েন্স গ্রুপের নির্বাহী পর্ষদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর নেতৃত্বে ভান্তারা গুজরাটে বড় পরিসরে বন্য প্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশ্ববিদ্যালয় বলেছে, ভান্তারার কাজ তাদের বৈশ্বিক সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্যবিষয়ক গবেষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
গুজরাটে রিলায়েন্সের তেল শোধনাগারের কাছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ হেক্টর জায়গাজুড়ে ভান্তারা গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে এক লাখ ৫০ হাজারের বেশি প্রাণী রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সিংহ, চিতাবাঘ ও কুমিরও রয়েছে।
ভান্তারায় কিছু প্রাণী কীভাবে আনা হয়েছে, তা নিয়ে বন্য প্রাণী সংরক্ষণকর্মীদের মধ্যে আগে থেকেই প্রশ্ন রয়েছে। তবে ভান্তারার বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়নি। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি তদন্তেও চিড়িয়াখানাটির পরিচালকদের অনিয়মের জন্য দায়ী করা হয়নি।
এদিকে নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্তে একাডেমিক ও পরিবেশবাদী মহলের কেউ কেউ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। ভারতের বুদ্ধিজীবী রামচন্দ্র গুহ প্রশ্ন তুলেছেন, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা আরও অনেক ব্যক্তি এই সম্মানের জন্য যোগ্য ছিলেন।
গুহের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়টি অনন্ত আম্বানিকে নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে যথাযথ যাচাই করেছে কি না, সেটিও প্রশ্নের বিষয়। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক মর্যাদায় প্রভাব ফেলতে পারে।
নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মুখপাত্র অবশ্য বলেছেন, অনন্ত আম্বানির বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, প্রাণী কল্যাণ ও পরিবেশের যত্নে কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই তাঁকে এই পদ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদের মধ্যেও এ নিয়োগ নিয়ে আপত্তির কথা উঠে এসেছে। নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড কলেজ ইউনিয়ন শাখার সভাপতি অধ্যাপক ম্যাট পেরি জানান, পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কর্মী এ নিয়োগের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লায়লা মেহতাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সরকারি অর্থায়ন কমে যাওয়ার পরিস্থিতিতে ধনী ব্যক্তি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণায় প্রভাব ফেলতে পারে।
গত এপ্রিল মাসে অনন্ত আম্বানি ‘ভান্তারা ইউনিভার্সিটি’ চালু করেন। এটিকে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও পশুচিকিৎসাবিজ্ঞানে বিশ্বের প্রথম বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
ভান্তারায় প্রাণী আমদানি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জার্মান সংবাদপত্র স্যুডডয়চে সাইটুংয়ের এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছিল, ভান্তারায় আনা অনেক প্রাণী এমন কয়েকটি দেশের মাধ্যমে এসেছে, যেখানে বন্য প্রাণী বাণিজ্য নিয়ে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিপন্ন প্রজাতির কিছু প্রাণী অবৈধভাবে আনা হয়ে থাকতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়।
এরপর বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা সাইটিস ভান্তারা নিয়ে একটি তথ্য অনুসন্ধান করে। সংস্থাটি বিপুলসংখ্যক প্রাণী আমদানির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার সুপারিশ করেছিল। তবে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের আপত্তির পর সাইটিস তাদের ওই সুপারিশ প্রত্যাহার করে নেয়।
আগস্টে ভান্তারা তাদের কার্যক্রমে ‘নতুন করে শুরু’ করার ঘোষণা দেয়। একই সঙ্গে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত সব ধরনের বন্য প্রাণী আমদানি বন্ধ রাখার কথা জানায়। ভান্তারা ও আম্বানি পরিবার এর আগে বন্য প্রাণী পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য হলো প্রাণীদের উদ্ধার, পুনর্বাসন ও যত্ন নেওয়া।