স্টাফ রিপোর্টার:
রাজধানীর কদমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফ হোসেনের বিরুদ্ধে একটি ধর্ষণ মামলার তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, ভুক্তভোগীকে হয়রানি এবং মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে থানা কর্তৃপক্ষ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলাটি আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তদন্তাধীন রয়েছে এবং তদন্তের স্বার্থেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
থানা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের অভিযোগে কদমতলী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন শানু আক্তার শান্তা। মামলাটি গ্রহণের পর নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয় এবং অভিযোগের বিভিন্ন দিক যাচাই-বাছাই শুরু হয়। পুলিশ বলছে, সংবেদনশীল এ ধরনের মামলায় শুধুমাত্র অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে তদন্ত সম্পন্ন করতে হয়। তাই তদন্তে সময় লাগা মানেই গাফিলতি নয়।
ওসি আশরাফ হোসেনের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, মামলার বাদী একাধিকবার থানায় এসে বিভিন্ন বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রতিবারই তাকে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে এবং তদন্তের অগ্রগতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। তবে তদন্তের গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তরের বিষয়ে যে অভিযোগ করা হয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলেন, জটিল বা আলোচিত মামলার ক্ষেত্রে উচ্চতর তদন্ত সংস্থার সহায়তা নেওয়ার বিষয়টি আইনগতভাবে অস্বাভাবিক নয়। এটি কোনোভাবেই মামলা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা বা বাদীকে নিরুৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে বলা হয়নি। বরং মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এ ধরনের পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।
এদিকে, বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী তাকে মামলা তুলে নেওয়া বা সমঝোতায় যেতে চাপ দেওয়া হয়েছে—এ অভিযোগও অস্বীকার করেছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, থানা থেকে কখনোই কোনো বাদীকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হয় না। বরং আইনের বিধান অনুযায়ী প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয় এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ার বিষয়েও পুলিশের ব্যাখ্যা রয়েছে। তাদের দাবি, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হলেই তাকে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার করা বাধ্যতামূলক নয়। আসামির অবস্থান নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই অভিযান পরিচালনা করা হয়। তদন্তের স্বার্থে অনেক তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব না হলেও আসামিকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে।
পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বাদী যেসব স্থানে আসামির অবস্থানের তথ্য দিয়েছেন, সেসব তথ্যও যাচাই করা হয়েছে। তবে প্রতিটি তথ্যই সঠিক বা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয় না। অনেক সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি অবস্থান পরিবর্তন করে বা আত্মগোপনে চলে যায়, যার কারণে গ্রেপ্তারে বিলম্ব হতে পারে।
এদিকে, এক নারী সাংবাদিকের পক্ষ থেকেও ওসি আশরাফ হোসেনের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে থানা সংশ্লিষ্টদের দাবি, দায়িত্ব পালনের সময় অনেক ক্ষেত্রেই আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে সব দাবি পূরণ করা সম্ভব হয় না। ফলে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে। পুলিশ সদস্যরা পেশাদারিত্ব বজায় রেখেই দায়িত্ব পালন করছেন বলে তারা উল্লেখ করেন।
কদমতলী থানা সূত্র আরও জানায়, থানায় দায়ের হওয়া প্রতিটি মামলাই নির্ধারিত আইনি কাঠামো অনুসরণ করে তদন্ত করা হয়। কোনো ব্যক্তি বা পক্ষের প্রভাব কিংবা চাপের ভিত্তিতে তদন্ত পরিচালিত হয় না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আর অভিযোগের সত্যতা না মিললে তদন্ত প্রতিবেদনেও সেই বিষয়টি প্রতিফলিত হবে।
ওসি আশরাফ হোসেনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে এসব অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমি আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি। কোনো বাদী বা অভিযোগকারীকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়নি। তদন্তের প্রয়োজনেই বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।”
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেন, পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ এলে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হয়। প্রয়োজন হলে বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে ধর্ষণ মামলার তদন্তও আইনানুগভাবে চলমান থাকবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এমন সংবেদনশীল মামলায় একদিকে যেমন ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি, অন্যদিকে অভিযোগের মুখে থাকা পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য ও আইনি প্রক্রিয়াকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো পক্ষ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।