আইরিশ পাব ঘিরে মদের ব্যবসার অভিযোগ, সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের পরিবারের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন

স্টাফ রিপোর্টার:

রাজধানীর নিউ জুরাইনে পরিচালিত আইরিশ পাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট ঘিরে বিদেশি মদের ব্যবসা, আমদানি নথির ঘাটতি, লাইসেন্সের ব্যবহার এবং তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর-শাশুড়ি ও স্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার তথ্যও সামনে এসেছে।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নূর ইসলাম। তিনি আইরিশ পাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। তাঁর স্ত্রী শিলা ইসলাম ছিলেন চেয়ারম্যান। পরিচালক হিসেবে ছিলেন সালমান মুক্তাদিরের স্ত্রী দিশা ইসলাম। তাসনীম ইসলামও প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারধারী ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শেখ নূর ইসলামের নামে ৪ হাজার, শিলা ইসলামের নামে ৩ হাজার এবং দিশা ইসলাম ও তাসনীম ইসলামের নামে দেড় হাজার করে মোট ৩ হাজার শেয়ার ছিল। অর্থাৎ নূর ইসলাম পরিবারের সদস্যদের নামে মোট ১০ হাজার শেয়ার ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযানে বিদেশি মদ, মেলেনি আমদানির নথি

২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে আইরিশ পাবে অভিযান চালায় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। অভিযানে স্কটল্যান্ড ও লন্ডন থেকে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ ইম্পেরিয়াল হুইস্কি এবং বিভিন্ন দামি ব্র্যান্ডের ভদকা পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অভিযানের সময় এসব বিদেশি মদের আমদানিসংক্রান্ত বৈধ নথিপত্র দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। পরে মদগুলো জব্দ করা হয়। আইরিশ পাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দাবি করেছিলেন, এসব মদ পর্যটন করপোরেশন থেকে কেনা হয়েছে। তবে সেই দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপস্থাপন করা হয়নি বলে শুল্ক কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে।

এ ঘটনায় অবৈধভাবে আমদানি করা মদ রাখার অভিযোগে রাজধানীর কদমতলী থানায় ফৌজদারি মামলা দায়ের করে শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ।

শুধু বিদেশি মদের আমদানি নয়, অভিযানে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) অনুমোদনবিহীন ৫৭টি ওয়াকিটকি সেটও উদ্ধারের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কৃষি যন্ত্রপাতির লাইসেন্সে মদ আমদানির অভিযোগ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানির লাইসেন্স ব্যবহার করে মদ, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ও ফার্নিচার আমদানির অভিযোগও রয়েছে শেখ নূর ইসলামের বিরুদ্ধে। এসব পণ্য শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জব্দ করেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

এ ছাড়া ২০১৬ সালের নথিপত্র ব্যবহার করে ২০১৯ সালে উৎপাদিত মদ বিক্রির অভিযোগও ওঠে। এসব ঘটনায় অবৈধ চোরাচালানের বিষয়টি সামনে আসে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সফিউর রহমান এ বিষয়ে বলেন, আইরিশ পাবে অভিযান হয়েছিল বলে তিনি শুনেছেন। ওই সময় কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

মামলা এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে

অভিযোগ রয়েছে, আইরিশ পাবের বিরুদ্ধে দায়ের করা ফৌজদারি মামলাটি একপর্যায়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে যায়। পরে মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) স্থানান্তর করা হয়।

অভিযানে অংশ নেওয়া এক শুল্ক কর্মকর্তার দাবি, আইরিশ পাবে অভিযান পরিচালনার পর থেকেই তাঁরা নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন। বিদেশি মদ বিক্রির বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির কাছে বিল অব এন্ট্রির নথিপত্রও ছিল না বলে তিনি দাবি করেন।

তবে তদন্ত বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যও রয়েছে। শেখ নূর ইসলাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

শেয়ার ছাড়লেও ব্যবসায় থাকার অভিযোগ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরবর্তীতে শেখ নূর ইসলাম দেলওয়ার হোসেন ও সেলিমুজ্জামানের কাছে আইরিশ পাবের শেয়ার হস্তান্তর করেন। তবে শেয়ার হস্তান্তরের পরও ব্যবসার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরপর ‘আইরিশ পাব অ্যান্ড বার লিমিটেড’ নামে কার্যক্রম চালানো এবং বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী এলাকায় একটি গুদাম স্থাপনের তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ওই গুদাম ব্যবহার করে বিদেশি মদের চালান সংরক্ষণের অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একাধিক শুল্ক কর্মকর্তার ভাষ্য, পানগাঁও কাস্টম হাউসের জেটিতে জাহাজ ভেড়ার পর নদীর বিপরীত পাড়ের কাছাকাছি অংশে পণ্য সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ওই সুযোগ ব্যবহার করে কোনো চক্র বিদেশি মদের চালান সরিয়ে গুদামজাত করত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রামাণ্য নথি পাওয়া যায়নি।

রেস্টুরেন্টের লাইসেন্সে বার পরিচালনার অভিযোগ

আইরিশ পাবের কার্যক্রম নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে লাইসেন্সকে ঘিরে। অভিযোগ রয়েছে, প্রথমে ‘ডোমিনাস লিমিটেড’ নামে একটি মদের বারের লাইসেন্স নেওয়া হলেও পরে রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স ব্যবহার করে বারের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘অনেক আগেই বিক্রি করে দিয়েছি’

সব অভিযোগের বিষয়ে শেখ নূর ইসলাম বলেন, আইরিশ পাব অ্যান্ড বার তিনি অনেক আগেই বিক্রি করে দিয়েছেন। রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স ব্যবহার করে মদের বার পরিচালনা এবং তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। বর্তমানে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

ফু-ওয়াংসহ আরও চার বারে এনবিআরের অভিযান

আইরিশ পাবের বাইরে শেখ নূর ইসলামের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা আরও কয়েকটি বার নিয়েও এনবিআরের অভিযান হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফু-ওয়াংসহ চারটি বারে অ্যালকোহল ও অ্যালকোহলজাত পণ্যের উৎস, আমদানি ও ক্রয়সংক্রান্ত নথি এবং শুল্ক-ভ্যাট ও আয়কর পরিশোধের তথ্য যাচাই করা হয়।

এনবিআর সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকার বিভিন্ন বার, রেস্টুরেন্ট, ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও শুল্কমুক্ত দোকানে অবৈধ উৎস থেকে অ্যালকোহল সংগ্রহের অভিযোগ পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মজুদ, আমদানি ও ক্রয়সংক্রান্ত দলিল, পণ্যের বৈধতা এবং শুল্ক-মূসক ও আয়কর পরিশোধের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

অভিযানকালে নথিপত্র ও মজুদ যাচাইয়ের পাশাপাশি অনিয়ম পাওয়া গেলে পণ্য আটকের কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে। এনবিআর জানিয়েছে, অভিযান শেষে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।

আইরিশ পাবকে ঘিরে বিদেশি মদের বৈধ উৎস, আমদানি নথি, লাইসেন্সের ব্যবহার, শেয়ার মালিকানা এবং একাধিক সংস্থার তদন্ত—সব মিলিয়ে ব্যবসাটির কার্যক্রম নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলোর চূড়ান্ত উত্তর নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও নথিপত্র যাচাইয়ের ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *