আমাদের কোনো নির্দিষ্ট অফিস নেই

মোঃআনজার শাহ
আমরা যারা মাঠের সাংবাদিক, তাদের কোনো নির্দিষ্ট অফিস নেই। কখনো রাজপথ, কখনো হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, কখনো আদালতের সিঁড়ি, কখনো বন্যার পানি, আবার কখনো আগুনে পুড়ে যাওয়া কোনো বাড়ির ধ্বংসস্তূপই আমাদের অফিস।
দিন শুরু হওয়ার আগেই একটি ফোনকলে আমাদের পরিকল্পনা বদলে যায়। চায়ের কাপ অর্ধেক রেখে, পরিবারের সঙ্গে কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে, কিংবা গভীর রাতের ঘুম ভেঙে আবার ছুটে যাই নতুন আরেকটি ঘটনার সাংবাদিক সাক্ষী হতে।
কখনো বিজয়ের মিছিলে মানুষের হাসি ক্যামেরাবন্দি করি, আবার কখনো কোনো এক মায়ের কান্নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই শক্ত রাখার অভিনয় করি। একদিন ফুলের গন্ধ, তো আরেকদিন বারুদের ধোঁয়া এই দুইয়ের মাঝখানেই আমাদের জীবন।
মাঠে সহকর্মীরাই আমাদের দ্বিতীয় পরিবার। একসঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, ফুটপাতে বসে এক কাপ চা ভাগাভাগি, বৃষ্টিতে ভিজে লাইভ দেওয়া, গাড়িতে বসে দুপুরের খাবার সেরে নেওয়া, কিংবা কাজ শেষে গভীর রাতে একে অপরকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া এসবই আমাদের প্রতিদিনের গল্প। আর এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই ক্লান্ত শরীরে জোগায় নতুন শক্তি, পরবর্তী দিনের জন্য।
পরের দিন আবার উত্তেজিত জনতার ধাক্কা, কখনো রাজনৈতিক সংঘর্ষের ইট, কখনো পুলিশের লাঠি, কখনো টিয়ারশেলের ধোঁয়া, কখনো হুমকি, কখনো ক্যামেরা ভাঙার চেষ্টা এসবকিছুর ভেতর দিয়েই আমরা খবর পৌঁছে দিই।
মাঝেমধ্যে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, যখন নিজের নিরাপত্তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অফিসে তথ্য পৌঁছে দেওয়া। কারণ ওই একটি মুহূর্ত মিস হলে মিস হয়ে যেতে পারে আরেকটি ইতিহাসের গল্প কিংবা তার সাক্ষ্য।
মজার বিষয় হলো, আমাদের ছুটির দিনও পুরোপুরি ছুটি নয়। ঈদের সকাল, জন্মদিন, পরিবারের অনুষ্ঠান কিংবা প্রিয় মানুষের অপেক্ষা সবকিছুর মাঝেও হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে, ‘দ্রুত অমুক জায়গায় যেতে হবে’ বলে তাড়া আসে। আর তখনই আবার শুরু হয় দৌড়…
বাইরের মানুষ দেখে শুধু টেলিভিশনের পর্দা, পত্রিকার হেডলাইন, কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত একটি ভিডিও। কিন্তু তারা কখনো দেখতে পায় না ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে থাকা, না খেয়ে কাজ করা, ভেজা কাপড়েই রিপোর্ট শেষ করা, কিংবা বাড়ি ফিরে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়া মানুষটিকে।
তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের কাছে একটা নেশার মতো। মানুষের গল্পকে মানুষের কাছেই ফিরিয়ে দিতে হবে এটিই যেন আমাদের অদৃশ্য প্রতিশ্রুতি। হয়তো এই কারণেই আবারও বেরিয়ে পড়ি একই রাস্তায়, একই ঝুঁকিতে, একই অজানা অভিযানে।

অপেক্ষা করি আরেকটি ব্রেকিং নিউজের…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *