মাছুদুর রহমান আসলাম:
সন্তানকে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকার কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে অনেক অভিভাবকই মনে করেন, সন্তান এখন নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার পথে। কিন্তু বাস্তবে সেই সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে, পড়াশোনায় কতটা মনোযোগী কিংবা তার আচরণ ও মানসিকতায় কী ধরনের পরিবর্তন আসছে—এসব বিষয়ে পরিবারের সদস্যরা কতটা খোঁজ রাখছেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
উচ্চশিক্ষার জন্য সন্তানকে ঢাকায় পাঠানো মানেই অভিভাবকের দায়িত্ব শেষ নয়। বরং পরিবার থেকে দূরে থাকার এই সময়ে সন্তানের প্রতি আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। কারণ একটি সন্তান কোন পরিবেশে বেড়ে উঠছে, কাদের সঙ্গে মিশছে এবং কোন ধরনের সংস্কৃতির প্রভাব গ্রহণ করছে—এসবই তার ভবিষ্যৎ ব্যক্তিত্ব ও আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
সচেতন মহলের মতে, কোনো সন্তানের কথাবার্তা, আচরণ কিংবা চলাফেরায় হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। বড়দের প্রতি অসম্মান, অশালীন ভাষা ব্যবহার, প্রকাশ্যে অন্য মানুষকে অপমান বা হেয় করার প্রবণতা কিংবা দায়িত্বহীন আচরণকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে নেওয়া ঠিক নয়।
তাই সন্তান কোথায় পড়ছে, কীভাবে সময় কাটাচ্ছে এবং তার মধ্যে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে—অভিভাবকদের সেদিকে নজর রাখা জরুরি। প্রতিদিন অন্তত দুই-চারবার সন্তানের সঙ্গে কথা বলা, তার পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া এবং সম্ভব হলে মাসে অন্তত একবার সরাসরি গিয়ে দেখা করারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় দেশের সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ রাজপথে নেমেছিল। স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর অন্যায়, নির্যাতন ও অবিচারের অভিযোগে অনেক অভিভাবকও ঘরে বসে থাকতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে এবং স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে।
পরবর্তী সময়ে দেশের জনগণ ভোটের মাধ্যমে নতুন সরকার নির্বাচিত করেছে। ফলে এখন দেশের সামনে নতুন বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদেরও নিজেদের দায়িত্ব নতুন করে উপলব্ধি করতে হবে।
আন্দোলনের সময় যে তারুণ্য রাজপথে ছিল, সেই তারুণ্যই এখন দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। তাই তাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো—শিক্ষাজীবন শেষ করা, জ্ঞান অর্জন করা এবং নিজেদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
আজকের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই আগামী দিনে তৈরি হবে দেশের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, শিক্ষক, গবেষক, উদ্যোক্তা, প্রশাসক ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্ব।
কেউ যদি ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, তাকে প্রকৌশল শিক্ষায় মনোযোগ দিতে হবে। কেউ ডাক্তার হতে চাইলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। কেউ ব্যারিস্টার কিংবা আইনজীবী হতে চাইলে আইন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য এখন প্রয়োজন মেধা, শিক্ষা, দক্ষতা, সততা ও দায়িত্ববোধ। তাই পড়াশোনা বাদ দিয়ে এখনই মন্ত্রী-এমপি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা কিংবা ক্ষমতার রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার চেয়ে নিজেদের যোগ্য করে তোলাই হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের প্রধান লক্ষ্য।
দেশে ভবিষ্যতে যদি কখনো জনগণের অধিকার, গণতন্ত্র কিংবা রাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো স্বৈরাচারী ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অধিকার দেশের নাগরিকদের থাকবে। শিক্ষার্থীরাও তখন নিজেদের বিবেক ও দায়িত্ববোধ থেকে ভূমিকা রাখতে পারে। সাধারণ মানুষও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাদের পাশে দাঁড়াবে—এটাই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
কিন্তু সেই ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নিতে হলে আজকের শিক্ষার্থীদের আগে নিজেদের শিক্ষা ও দক্ষতার ভিত্তি শক্ত করতে হবে।
কারণ একটি দেশের পরিবর্তন শুধু রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ হয় না; সেই পরিবর্তনকে টেকসই করতে প্রয়োজন শিক্ষিত, দক্ষ ও দায়িত্বশীল প্রজন্ম।
সন্তানকে ঢাকার কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর পর শুধু মাসের খরচ পাঠিয়েই কি দায়িত্ব শেষ?
সন্তান কী পড়ছে? কার সঙ্গে মিশছে? তার কথাবার্তায় কী পরিবর্তন এসেছে? তার চলাফেরা ও সামাজিক আচরণ কেমন? সে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর জানার দায়িত্ব অভিভাবকেরই।
তাই এখনও সময় আছে। সন্তানকে শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতা নয়, সময় দিন; তার সঙ্গে কথা বলুন, তাকে বোঝার চেষ্টা করুন এবং প্রয়োজন হলে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনুন।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদেরও মনে রাখতে হবে—দেশ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি নিজেদেরও পরিবর্তন করতে হবে।
আজকের পড়াশোনা, পরিশ্রম ও যোগ্যতাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ার মূল ভিত্তি। তাই মন্ত্রী-এমপি হওয়ার স্বপ্ন দেখার আগে নিজেকে ডাক্তার, প্রকৌশলী, আইনজীবী, শিক্ষক, গবেষক কিংবা একজন যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখুন।
কারণ দেশকে এগিয়ে নিতে শুধু রাজপথের সাহস নয়, শ্রেণিকক্ষের মেধা, কর্মক্ষেত্রের দক্ষতা এবং চরিত্রের সততাও প্রয়োজন।