কামরুল ইসলাম:
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে চুরি ও ডাকাতির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। একের পর এক বাড়িতে চুরি, ডাকাতি, দোকান লুট ও যানবাহন চুরির ঘটনায় রাতের বেলায় ঘরবাড়ির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ পরিস্থিতিতে লোহাগাড়া-সাতকানিয়ার সংসদ সদস্য মোঃ শাহজাহান চৌধুরী এবং বিএনপির সিনিয়র নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকার সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, সম্প্রতি লোহাগাড়ার বিভিন্ন ইউনিয়নে সংঘবদ্ধ চোর ও ডাকাত চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। চোর-ডাকাতরা গভীর রাতে অথবা পরিবারের সদস্যরা বাড়ির বাইরে থাকার সুযোগে ঘরের তালা, সিটকানি কিংবা জানালার গ্রিল ভেঙে প্রবেশ করে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও অস্ত্রের মুখে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে ডাকাতির অভিযোগও উঠেছে।
সম্প্রতি লোহাগাড়ার মাস্টার হাট এলাকার সাংবাদিক কামরুল ইসলামের বাড়ি এবং আমিরাবাদ ছৈয়দ পাড়ার সাংবাদিক ফাহাদের বাড়িতে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটে। এছাড়া আধুনগর বাজারের কয়েকটি দোকানে লুটের ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এসব ঘটনায় নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান মালামাল খোয়া যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
সাংবাদিকের বাড়িতে ৫ লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকার চুরি
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে সংঘবদ্ধ চোরের দল সাংবাদিক কামরুল ইসলামের বাড়িতে প্রবেশ করে আলমারি ও ড্রয়ার ভেঙে নগদ ৫ লাখ টাকা এবং প্রায় ৩ ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গভীর রাতে পরিবারের সদস্যদের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে চোরচক্র ঘরের তালা বা সিটকানি ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে আলমারি ও ড্রয়ার ভেঙে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করে পালিয়ে যায়।
ঘটনার পর থেকে লোহাগাড়ার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দাদের মধ্যে ‘রাত নামলেই চুরি-ডাকাতির আতঙ্ক’ তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবার রাতের বেলায় বাড়িঘর পাহারা দেওয়ার জন্য বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ভুক্তভোগী সাংবাদিকের পক্ষ থেকে স্থানীয় থানাকে বিষয়টি অবহিত করা হলেও পুলিশের দৃশ্যমান তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী। তবে পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
গত দেড় মাসে একাধিক চুরির ঘটনা
স্থানীয়দের দেওয়া বিভিন্ন ঘটনার তথ্য পর্যালোচনা করে জানা যায়, গত দেড় মাসে লোহাগাড়া উপজেলার একাধিক ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় চুরি ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। কোথাও নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার, কোথাও মোটরসাইকেল বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা, আবার কোথাও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মালামাল চুরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শুক্রবার রাতে কলাউজান ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আদারচর এলাকায় শিক্ষক আলিম সামাদের বসতঘরে চুরির ঘটনা ঘটে। চোরেরা নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকারসহ প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে যায় বলে তিনি জানিয়েছেন।
একই রাতে সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের তালুকদার পাড়ায় প্রবাসী জসিম উদ্দিনের বাড়িতেও চুরির ঘটনা ঘটে। একই রাতে বড়হাতিয়া ইউনিয়নের আমতলী বেপারী পাড়া থেকে মুজিবুর রহমানের একটি সিএনজিচালিত গাড়ি চুরি করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। এর কয়েক দিন আগে, ২৩ আগস্ট রাতে আমিরাবাদ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আমির খান চৌধুরী পাড়ায় কফিল উদ্দিনের বসতঘরে ঢুকে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে যায় চোরেরা। একই এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকা আনোয়ার হোসেনের একটি মোটরসাইকেলও চুরি হয়। ওই রাতেই আরও দুটি বাড়িতে চুরির চেষ্টা চালানো হয় বলে স্থানীয়রা জানান। তবে বাড়ির লোকজন সজাগ হয়ে উঠলে চোরেরা পালিয়ে যায়।
অস্ত্রের মুখে ডাকাতি, লুটের অভিযোগ ১৮ লাখ টাকা
চুরির পাশাপাশি ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনাও স্থানীয়দের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত ১৭ আগস্ট ভোরে উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মল্লিক ছোবহান তজু মুন্সির গ্যারেজ এলাকায় অস্ত্রের মুখে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে বসতঘরে ডাকাতির অভিযোগ ওঠে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসী জমির উদ্দিন ও হেলাল উদ্দিনের পরিবারের দাবি, ডাকাতরা নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোনসহ প্রায় ১৮ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এ ঘটনার পর ওই এলাকার মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়ে যায়।
মসজিদেও চোরের হানা
চোরদের হাত থেকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও রেহাই পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। গত ৩ আগস্ট রাতে সদর ইউনিয়নের দরবেশহাট এলাকার শাহী দরবেশিয়া জামে মসজিদের জানালার গ্রিল কেটে ভেতরে প্রবেশ করে চোরেরা। পরে মসজিদের আইপিএসের ব্যাটারি ও দানবাক্স ভেঙে নগদ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। এর আগে গত ১৯ জুলাই রাতে চুনতি ইউনিয়নের সুফিনগর মসজিদে আর-রাহমা থেকে প্রায় ৪০০ গজ বৈদ্যুতিক তার কেটে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ২০ আগস্ট কলাউজান ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আদারচর এলাকায় মোহাম্মদ আলী হায়দারের ফাঁকা বসতঘরেও চুরির ঘটনা ঘটে। এছাড়া গত ১৪ জুলাই রাতে আমিরাবাদ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আমির খান চৌধুরী পাড়ায় প্রবাসী জুনু মিয়ার ফাঁকা বাড়িতে চুরি হয়। পরিবারের দাবি, ওই বাড়ি থেকে প্রায় ৬ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ ২০ হাজার টাকা নিয়ে যায় চোরেরা।
ফাঁকা বাড়িই চোরদের প্রধান টার্গেট
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিবারের সদস্যরা বাড়ির বাইরে গেলেই অনেক সময় চোরেরা সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাওয়া, আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া কিংবা কয়েক দিনের জন্য বাড়ি ফাঁকা রাখাকে কেন্দ্র করে চুরির ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, এলাকায় অপরিচিত লোকজনের চলাচল নিয়ে অনেক সময় সন্দেহ হলেও যথাযথ নজরদারি না থাকায় তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত পুলিশি টহল এবং নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকসেবী, অনলাইন জুয়ায় আসক্ত ব্যক্তি ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের একটি অংশ ছোটখাটো অপরাধ থেকে বড় ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন নির্জন সড়ক ও এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সামাজিক মর্যাদা, ভয় কিংবা মামলা-সংক্রান্ত জটিলতার আশঙ্কায় অনেক ভুক্তভোগী ঘটনা প্রকাশ্যে আনতে চান না বলেও জানান স্থানীয়রা।
চিকিৎসার টাকা হারিয়ে দুশ্চিন্তায় শিক্ষক আলিম সামাদ
সর্বশেষ চুরির ঘটনায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শিক্ষক আলিম সামাদ। তিনি জানান, চুরির দিন পারিবারিক নানা সমস্যায় তিনি ব্যস্ত ছিলেন। তার স্ত্রী অসুস্থ থাকায় সারাদিন তাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। সন্ধ্যার দিকে তার মা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যরা তাকে নিয়ে পাশের এলাকায় বসবাসরত বড় ভাই আবু বক্করের বাড়িতে চলে যান। এ সময় বাড়ি ফাঁকা থাকার সুযোগে চোরেরা ঘরে প্রবেশ করে বলে জানান তিনি। আলিম সামাদ বলেন, চুরি হওয়া নগদ টাকা তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও জায়গা থেকে ধার-কর্জ করে সংগ্রহ করেছিলেন। সেই টাকা চুরি হয়ে যাওয়ায় এখন স্ত্রীর চিকিৎসা কীভাবে চালাবেন, তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
মাদক, জুয়া ও কিশোর গ্যাং নিয়েও উদ্বেগ
সচেতন মহলের মতে, চুরি-ডাকাতি বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। এর পেছনে মাদক, অনলাইন জুয়া, বেকারত্ব, অসৎ সঙ্গ এবং পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়সহ বিভিন্ন কারণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে দ্রুত টাকা পাওয়ার আশায় তরুণদের একটি অংশ সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছে। পরে সেই অর্থের ঘাটতি পূরণ করতে কেউ কেউ চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে শুধু চুরি-ডাকাতির ঘটনায় মামলা ও গ্রেপ্তার নয়, অপরাধের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধও জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
তাদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে নিয়মিত পুলিশি টহল, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারি, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে পুলিশের সমন্বয় আরও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মাদক, অনলাইন জুয়া ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা গেলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
এমপি ও বিএনপির সিনিয়র নেতাদের হস্তক্ষেপ কামনা
এলাকাবাসীর দাবি, লোহাগাড়ার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে রাতের বেলায় পুলিশের টহল আরও জোরদার করার পাশাপাশি চুরি-ডাকাতির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। লোহাগাড়া-সাতকানিয়ার সংসদ সদস্য মোঃ শাহজাহান চৌধুরী এবং বিএনপির সিনিয়র নেতৃবৃন্দের প্রতি স্থানীয়দের আহ্বান—এলাকার মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম আরও জোরদারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হোক। স্থানীয়দের ভাষ্য, সাধারণ মানুষ রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চান। এজন্য লোহাগাড়া থানার পুলিশ সদস্যদের রাতের দায়িত্ব ও টহল কার্যক্রম আরও জোরদার করা এবং চুরি-ডাকাতির ঘটনাগুলোর দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।
পুলিশের বক্তব্য
সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, চুরি-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে। অপরাধপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পুলিশের টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটলে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। মাদক, অনলাইন জুয়া ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধেও পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধ দমনে পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত পুলিশকে জানাতে হবে।