উত্তরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে প্রশ্ন

ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি:

ঝাড়ুদার ও নকল নবীশের বিরুদ্ধে দলিল প্রক্রিয়াকরণে প্রভাব বিস্তার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

রাজধানীর উত্তরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দলিল নিবন্ধন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে কয়েকজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অফিসের ঝাড়ুদার পদে কর্মরত মঞ্জু এবং নকল নবীশ সাহেদ। তাঁদের বিরুদ্ধে দলিল নিরীক্ষা ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, নকলের ফি আদায় এবং দলিল লেখকদের জিম্মি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর অধিদপ্তরের ৭৮১ নম্বর স্মারকে আব্দুল বারেকের ছেলে মঞ্জু দৈনিক ৬০ টাকা মজুরিতে ঝাড়ুদার পদে নিয়োগ পান। এরপর থেকে তিনি অফিসের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর সঙ্গে নকল নবীশ সাহেদকে নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

অভিযোগকারীদের দাবি, ঝাড়ুদার হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও মঞ্জুকে দলিল নিরীক্ষা, দলিল যাচাই এবং নিবন্ধন-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে সক্রিয় দেখা যায়। এমনকি সাব-রেজিস্ট্রারের পাশে দাঁড়িয়ে দলিল পরীক্ষা করা এবং তাঁর ইশারায় দলিল নিবন্ধনের কাজ পরিচালিত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, উত্তরা এলাকার বিভিন্ন আবাসন ও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের বড় দলিল নিবন্ধন কার্যক্রমে মঞ্জু ও সাহেদের প্রভাব রয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে দলিল লেখকদের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে অর্থ আদায় এবং ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে।

মঞ্জুর বিরুদ্ধে উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরে ছয়তলা বাড়ি, উত্তরা এলাকায় নামে-বেনামে দুটি খালি প্লট এবং ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় বাড়ি ও কৃষিজমিসহ বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রায় ১৬ বছরের কর্মজীবনে তাঁর আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে এসব সম্পদের মালিকানা ও উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এ ছাড়া ২০২২ সালে মঞ্জু তাঁর ভাগিনা রাজীবকে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই উত্তরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নকল নবীশ হিসেবে কাজে যোগদান করান বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারের অনুমোদন ছাড়া কীভাবে রাজীব সেখানে কাজ করছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, দৈনিক ৬০ টাকা মজুরির ভিত্তিতে মাসিক আয় মাত্র ১ হাজার ৮০০ টাকা হলেও এ ধরনের পদে কাজ করা ব্যক্তিদের প্রকৃত দায়িত্ব ও নিয়োগের বৈধতা যাচাই করা প্রয়োজন।

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নকল নবীশদের দায়িত্ব হলো নিবন্ধিত দলিলের নকল প্রস্তুত করা। কিন্তু উত্তরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নকল নবীশ সাহেদের বিরুদ্ধে নিয়মিত নকল না লিখে নকলের ফি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মঞ্জুর সঙ্গে যোগসাজশে সাহেদ নকলের ফি আদায়ের দায়িত্ব পালন করেন এবং এ প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি নিয়মে নকলের প্রতি পৃষ্ঠার ফি ৪০ টাকা হলেও সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের কারণে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে। নকলের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলা এবং নকল সরবরাহের প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে সাহেদের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য অফিসের নকল সরবরাহ, ফি আদায় ও দলিল সংরক্ষণের রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

সাহেদের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর গাড়ি ও সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা হলে আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসতে পারে। তবে অভিযোগে উল্লেখিত সম্পদের মালিকানা ও অর্থের উৎস সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, মঞ্জু ও সাহেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), আইন মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ জমা দেওয়ার কথা বলা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তাঁরা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নিয়োগের বৈধতা যাচাই, সরকারি ফি আদায়ের হিসাব পরীক্ষা এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে মঞ্জু, সাহেদ, উত্তরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং জেলা রেজিস্ট্রারের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, সম্পদের তথ্য ও নিয়োগসংক্রান্ত রেকর্ড যাচাই করা জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *