মনির হোসেন মিজি:
তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রসহ বিভিন্ন নদীতে বছরে ৫০ থেকে ৬০ টন ইলিশ আহরণ, নাব্য সংকটে কমছে বিচরণ
একসময় ইলিশ বলতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীর কথাই মনে করা হতো। তবে সেই পরিচিত ধারণা বদলে এখন উত্তরাঞ্চলের নদীতেও ধরা পড়ছে জাতীয় মাছ ইলিশ। রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার ১১টি উপজেলায় তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রসহ বিভিন্ন নদীতে মিলছে এ সুস্বাদু মাছ। তবে পরিমাণ এখনো তুলনামূলক কম।
নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা এবং জেলেদের নৌকা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা গেলে এ অঞ্চলে ইলিশ উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন মৎস্য কর্মকর্তারা।
মা ইলিশের প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে সারা দেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, বাজারজাত ও ক্রয়-বিক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। পাশাপাশি ২০০৩-০৪ সাল থেকে জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচি চালু হওয়ায় দেশে ইলিশের উৎপাদন আগের তুলনায় বেড়েছে। চলতি বছরও ইলিশ আহরণ বাড়বে বলে আশা করছেন মৎস্য খাতসংশ্লিষ্টরা।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের তিন জেলার ১১টি উপজেলায় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে কুড়িগ্রামের ছয়টি, গাইবান্ধার চারটি এবং লালমনিরহাটের একটি উপজেলা রয়েছে। কুড়িগ্রামের সদর, নাগেশ্বরী, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর; গাইবান্ধার সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি এবং লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদে ইলিশ ধরা পড়ছে।
তবে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীর তুলনায় এসব নদীতে ইলিশের পরিমাণ অনেক কম। প্রতিবছর এই তিন জেলায় গড়ে ৫০ থেকে ৬০ টন ইলিশ পাওয়া যায়। গত মৌসুমে আহরণ হয়েছিল ৪৮ টন।
গত ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশের মতো এই তিন জেলাতেও ইলিশ ধরা বন্ধ ছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষে ২৯ অক্টোবর থেকে জেলেরা আবার নদীতে নামতে শুরু করেছেন। এ সময়ে ১ হাজার ৬০০ জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে নৌকার সংকটের কারণে অনেক জেলে চাইলেও নদীতে যেতে পারছেন না।
মৎস্য কর্মকর্তাদের মতে, উত্তরের নদ-নদীতে ইলিশের বিস্তারে সবচেয়ে বড় বাধা নাব্য সংকট। তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনায় মাঝেমধ্যে ইলিশের দেখা মিললেও নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় মাছের বিচরণ ও প্রজননের পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি জেলেদের প্রয়োজনীয় নৌকা ও কারিগরি সহায়তার অভাবও মাছ আহরণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
কুড়িগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, নদীগুলোতে নাব্য সংকটের পাশাপাশি জেলেদের কারিগরি সহায়তারও ঘাটতি রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ থেকে সাত বছর আগেও তিস্তার গঙ্গাচড়া মহিপুর এলাকায় ইলিশ পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে ওই এলাকায় ইলিশের দেখা প্রায় মেলে না।
অবসরপ্রাপ্ত মৎস্য জরিপ কর্মকর্তা জুবায়ের আলী বলেন, ইলিশ মূলত সাগরের মাছ। সাগরের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে এমন নদীতে ইলিশের বিচরণ দেখা যায়। বর্ষাকালে ব্রহ্মপুত্র নদ খরস্রোতা থাকায় এ সময় সেখানে ইলিশ পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, একসময় তিস্তাও খরস্রোতা ছিল। তখন সাগর থেকে ইলিশ ডিম ছাড়তে এ নদীতে আসত। এ অঞ্চলে ইলিশের বিচরণ বাড়াতে নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই। নদীগুলোতে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে উত্তরের নদীতেও ইলিশের পরিমাণ বাড়তে পারে।
নদীতে ইলিশ পাওয়া গেলেও তা আহরণ করে লাভের মুখ দেখতে পারছেন না অনেক জেলে। নৌকার অভাব, ভাড়া এবং মাছ ধরার খরচ বেড়ে যাওয়ায় তাঁদের অনেকে নদীতে যেতে পারছেন না।
কুড়িগ্রামের উলিপুরের মাঝিপাড়া এলাকার মৎস্যচাষি নয়ন চন্দ্র বলেন, চলতি মৌসুমে ব্রহ্মপুত্রে ইলিশ তুলনামূলক কম পাওয়া যাচ্ছে। তিনি এক কেজি ওজনের ইলিশ পাইকারি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছেন। নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারি সহায়তা হিসেবে ২৫ কেজি চাল পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।
কুড়িগ্রামের জেলে কাঞ্চন কুমার বলেন, জেলেদের মাছ ধরার নৌকার সংখ্যা কমে গেছে। ফলে আগের মতো নদীতে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মাছ ধরতে গেলে অন্তত ২ হাজার টাকা খরচ হয়। এর সঙ্গে নৌকা ভাড়াও রয়েছে। যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যায়, তা বিক্রি করে খরচ তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি জানান, ব্রহ্মপুত্রে আধা কেজির কম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং বড় আকারের ইলিশ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কালীপূজা পর্যন্ত নদীতে ইলিশ পাওয়া যেতে পারে। এরপর মাছের পরিমাণ অনেক কমে যাবে বলে ধারণা তাঁর।
অন্যদিকে, লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তাপাড়ের জেলে আব্দুল গনি জানান, চলতি বছর তাঁরা তিস্তা থেকে মাত্র ১৫ কেজি ইলিশ ধরতে পেরেছেন। নৌকার সংকট এবং নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় মাছ আহরণ কঠিন হয়ে পড়েছে।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সাহাদত হোসেন বলেন, রাজিবপুর ও রৌমারী উপজেলার তুলনায় নাগেশ্বরীতে ইলিশ কম পাওয়া যাচ্ছে।
রংপুর মৎস্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার ১১টি উপজেলায় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার সময় তিন জেলার ১ হাজার ৬০০ জেলেকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের নাব্য সংকটের কারণে ইলিশসহ অন্যান্য দেশীয় মাছের প্রাপ্যতা কমছে। নদীগুলোর নাব্য ফিরিয়ে আনতে পারলে এ অঞ্চলে ইলিশ উৎপাদনের ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হবে। সরকার তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র খননের উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। নদী খনন করা গেলে ইলিশসহ দেশীয় প্রজাতির অন্যান্য মাছের বিচরণও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
মৎস্যসংশ্লিষ্টদের মতে, উত্তরের নদ-নদীতে ইলিশের উপস্থিতি এ অঞ্চলের মৎস্য খাতের জন্য নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা, নাব্য ফিরিয়ে আনা এবং জেলেদের নৌকা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ জরুরি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে দক্ষিণাঞ্চলের পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলও একসময় ইলিশ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পরিণত হতে পারে।