একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে প্রশংসায় এসপি মুন্সী

মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:

থানায় সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষ যাতে কোনো ধরনের হয়রানি, দুর্নীতি বা অনিয়মের শিকার না হন, সে লক্ষ্যেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ। জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সীর নেতৃত্বে গত কয়েক মাসে দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা, চাঁদাবাজি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বদলি, প্রত্যাহার এবং প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

জেলা পুলিশের এই কঠোর অবস্থানকে সাধারণ মানুষ, সুশীল সমাজ, স্থানীয় সাংবাদিক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এ ধরনের পদক্ষেপ অত্যন্ত সময়োপযোগী।

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এসপি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী অপরাধ দমন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনবান্ধব পুলিশিং নিশ্চিত করতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করছেন। তাঁর নির্দেশনায় মাদক, কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, বাল্যবিবাহ ও সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে জেলা পুলিশের অভিযান জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে থানাগুলোতে সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি বন্ধে নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গত কয়েক মাসে জেলার অন্তত চারটি থানায় কর্মরত একাধিক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

গত ৯ জুন রাতে চাঁদাবাজি এবং সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগে আড়াইহাজার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) হাসনাঈন আহমেদকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়।

এর আগে ৭ জুন দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বন্দর থানার এসআই মাসুদ রানাকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বন্দরে ছুরিকাঘাতে নিহত এক যুবকের পরিবার মামলা করতে গেলে তিনি তাদের কাছে ঘুষ দাবি করেছিলেন।

এ ছাড়া গত ৮ জুন বন্দর থানার আরও তিন উপ-পরিদর্শক—মনির হোসেন, শহিদুল ইসলাম ও ফারুককে বদলি করা হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রকাশিত হলেও বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দিন জানান, এটি প্রশাসনিক রদবদলের অংশ। মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন এবং সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হয়নি।

এর আগে গত ৬ মে ফতুল্লার দেওভোগ হাশেমবাগ এলাকায় পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে হাতকড়াসহ পাঁচ আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ফতুল্লা মডেল থানার ছয় পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে একজন এসআই, একজন এএসআই এবং চারজন কনস্টেবল ছিলেন।

অন্যদিকে, গত ১৫ মার্চ মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে রূপগঞ্জ থানার তিন উপ-পরিদর্শক—হুমায়ুন আহমেদ, আহসানউল্লাহ ও নাদিরুল ইসলামকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়।

এসব ঘটনার বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী বলেন,

“যাদের বদলি করা হয়েছে, তাদের মধ্যে কিছু স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ। তবে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জনগণকে মানসম্মত ও হয়রানিমুক্ত পুলিশি সেবা দিতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না।”

সেবাপ্রার্থীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন,

“থানায় সেবা নিতে এসে কেউ যদি হয়রানির শিকার হন, তাহলে সরাসরি আমাকে জানাবেন। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আমরা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করছি। ভালো কাজের জন্য পুরস্কার যেমন থাকবে, তেমনি অনিয়মের জন্য শাস্তিও অব্যাহত থাকবে।”

জেলা পুলিশ সূত্রে আরও জানা গেছে, অতীতে জিডি করা, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সংগ্রহ, মামলা গ্রহণ কিংবা বিভিন্ন পুলিশি সেবা পেতে গিয়ে অনেক সাধারণ মানুষকে নানা ধরনের হয়রানির মুখোমুখি হতে হতো। এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে এখন নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষ বা অপরাধীদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে ফৌজদারি মামলাও করা হবে।

স্থানীয় সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, পুলিশ বাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে এসপি মিজানুর রহমান মুন্সীর এই কঠোর অবস্থান একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। তাদের মতে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে এমন নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা অব্যাহত থাকলে পুলিশি সেবার মান যেমন বাড়বে, তেমনি সাধারণ মানুষের আস্থাও আরও সুদৃঢ় হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *