বিশেষ প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোডসংলগ্ন বলাকা আবাসিক এলাকায় ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তিতে কোনো ধরনের অধিগ্রহণ, নোটিশ, টেন্ডার, সরকারি বাজেট কিংবা অনুমোদিত নকশা ছাড়াই রাস্তা নির্মাণের চেষ্টা এবং বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী ভূমির মালিকের অভিযোগ, তার নিজস্ব মালিকানাধীন জায়গার ওপর থাকা ভাড়াঘর ভেঙে দিয়ে সিটি করপোরেশনের একটি অংশ রাস্তা নির্মাণের চেষ্টা করছে। এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ভুক্তভোগী মোঃ আইয়ুবের দাবি, বাকলিয়া এক্সেস রোডসংলগ্ন বলাকা আবাসিক এলাকার আরএস ৯০ নং খতিয়ানভুক্ত আরএস দাগ নং ৩৩৫৬/৩৩৫৭ এবং পরবর্তী সময়ে বিএস নামজারি ১৬৪৩৮, ২৬-৫০২৭ ও ২৬-৫২২৯ নং খতিয়ানভুক্ত বিএস দাগ নং ১৭২৩৮-এর খরিদা সূত্রে তিনি ভূমির মালিক। সরকারি বিধি অনুযায়ী ভূমি রেজিস্ট্রির সময় প্রয়োজনীয় আইনানুগ কর ও অন্যান্য ফি পরিশোধ করেছেন বলেও জানান তিনি। তার দাবি, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখের ২৬১৮ নং দলিল, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের ৬৮০০ নং এবং ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের ২৩৮ নং কবলা দলিলের মাধ্যমে বিএস ১৭২৩৮ নং দাগের সম্পত্তি ক্রয় করে পরিবার-পরিজন নিয়ে সেখানে বসবাস করে আসছেন।
ভূমির মালিকের ভাষ্য অনুযায়ী, তার মালিকানাধীন জায়গাটির আশপাশে বসবাসরত প্রতিটি পরিবারের চলাচলের জন্য পৃথক ও প্রশস্ত পথ রয়েছে। এমন বিকল্প চলাচলের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও তার ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সম্পত্তির ভেতর দিয়ে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার প্রশ্ন, কোনো ভূমি অধিগ্রহণ না করে, মালিককে যথাযথ নোটিশ না দিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট জমির বিষয়ে সরকারি কোনো অনুমোদন, টেন্ডার, বাজেট কিংবা আরএস/বিএস সিটের রোডম্যাপ ছাড়া কীভাবে ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গার ওপর রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ভুক্তভোগী আরও অভিযোগ করেন, চসিকের সুপারভাইজার মোঃ কামাল উদ্দীন দীর্ঘদিন ধরে তার ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর দিয়ে চলাচলের রাস্তা নির্মাণের বিষয়ে তৎপরতা চালিয়ে আসছেন। তবে কী কারণে এবং কার স্বার্থে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা তার কাছে স্পষ্ট নয়। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
মোঃ আইয়ুবের স্ত্রী অভিযোগ করে বলেন, তাদের নিজস্ব জায়গা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অবৈধ অর্থের লেনদেনের মাধ্যমে একটি ষড়যন্ত্র চলছে বলেও তিনি দাবি করেন। তাদের একাধিকবার মৌখিকভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
ভূমির মালিকের দাবি, তার সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ এবং সেখানে রাস্তা নির্মাণের চেষ্টার ঘটনায় তিনি ইতোমধ্যে আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন। এ বিষয়ে আদালতে মামলা দায়েরের পর তিনি নিষেধাজ্ঞাও পেয়েছেন বলে জানান। তার প্রশ্ন, আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তিতে অভিযান চালিয়ে ভাড়াঘর ভেঙে রাস্তা নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, চসিকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চৈতি সর্ববিদ্যা, চসিকের স্ট্রাইকিং ফোর্স এবং চকবাজার থানা পুলিশের সদস্যদের উপস্থিতিতে ব্যক্তি মালিকানাধীন ওই জায়গায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় চসিকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা রয়েছে—এমন কথা বলা হয়েছে বলে দাবি করেন ভুক্তভোগী। তার অভিযোগ, অভিযানের সময় বলপ্রয়োগ করে ভাড়াঘর ভেঙে সেখানে রাস্তা নির্মাণের চেষ্টা করা হয়। বর্তমানে ওই জায়গায় রাস্তা নির্মাণের অপচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এ বিষয়ে সাংবাদিকরা চসিকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ভূমি অধিগ্রহণ, রাস্তা নির্মাণের টেন্ডার এবং বাজেট বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে চসিকের হেড অফিসে যোগাযোগ করতে বলেন বলে জানা গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অনুমোদন, জমি অধিগ্রহণ বা টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পর্কে চসিকের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিস্তারিত বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি বৈধ কাগজপত্রের মাধ্যমে জমির মালিকানা অর্জন করে থাকেন এবং এরপরও তাকে নিজের সম্পত্তিতে এভাবে হয়রানি বা হেনস্তার শিকার হতে হয়, তাহলে বিষয়টি সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগের। তার মতে, অভিযোগটি যথাযথভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা প্রয়োজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বিএনপি নেতা বলেন, মেয়রের অনুপস্থিতিতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি সিটি করপোরেশনের ভাবমূর্তির জন্যও বিব্রতকর। তার দাবি, ঘটনাটি সঠিকভাবে তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন—এটি কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নাকি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অংশ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বগারবিল এলাকায় একাধিক নিরীহ মানুষের শেষ সম্বল হিসেবে থাকা জমি নিয়ে নানা ধরনের বিরোধ ও চাপের ঘটনা ঘটছে। ফলে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। একই সঙ্গে জমির মালিকানা, রাস্তা নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা, সরকারি অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, প্রকল্পের বাজেট এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া—সবকিছু যাচাই করে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ভুক্তভোগী মোঃ আইয়ুব বলেন, তিনি কোনো সরকারি উন্নয়নকাজের বিরোধিতা করছেন না। তবে তার বৈধ মালিকানাধীন সম্পত্তি আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে দখল বা ক্ষতিগ্রস্ত করে রাস্তা নির্মাণের চেষ্টা করা হলে তিনি তার প্রতিকার চান। তিনি বলেন, যদি সরকারি প্রয়োজনে কোনো জমি প্রয়োজন হয়, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা উচিত।
এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত, আদালতের আদেশের যথাযথ বাস্তবায়ন এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তিতে কোনো ধরনের বলপ্রয়োগের অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। একই সঙ্গে তারা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
তবে রাস্তা নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট জমিটি আদৌ সরকারি প্রকল্পের আওতাভুক্ত কি না, এ বিষয়ে কোনো অনুমোদিত নকশা, প্রকল্পের বাজেট বা টেন্ডার রয়েছে কি না এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি চসিক কর্তৃপক্ষ কীভাবে দেখছে—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, আদালতের আদেশ এবং ভূমির মালিকানার কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।