স্টাফ রিপোর্টার:
রাজধানীতে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকারের ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) কর্মসূচির আওতায় চাল ও আটা বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত স্থানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে থাকা ভোক্তাদের কাছে পর্যাপ্ত চাল ও আটা বিক্রি না করে পণ্য মজুত রেখে ‘চাল শেষ’ বলে বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। পরে ভোক্তারা চলে গেলে ট্রাক সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
অভিযোগের তীর ওএমএসের ডি-৭ এলাকার দুই ডিলার মো. রাসেল আহমেদ ও মো. জাফর আহমেদের দিকে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সাধারণ ভোক্তাদের কাছে চাল ও আটা বিক্রি না করে অতিরিক্ত দামে সিন্ডিকেটের কাছে পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে, আজ ডিলার মো. রাসেল আহমেদের ওএমএস বিক্রির স্থান ছিল কল্যাণপুর নতুন বাজার এলাকায়। অন্যদিকে ডিলার মো. জাফর আহমেদের ট্রাক সেল ছিল মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনসংলগ্ন ৫ নম্বর পিলার, পিলার নম্বর ২০৬-এর পাশে। সেখানে নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী চাল ও আটা বিক্রি করা হচ্ছিল।
স্থানীয় ভোক্তাদের অভিযোগ, দুপুর ১টার পর হঠাৎ করে তাদের জানানো হয় চাল শেষ হয়ে গেছে। অথচ ওই সময় ট্রাকে পর্যাপ্ত পরিমাণ চাল ও আটা মজুত ছিল বলে তারা দেখতে পান। এতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা নিম্নআয়ের মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভোক্তা বলেন, তারা দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে চাল ও আটা কেনার অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু ট্রাকে চাল থাকার পরও তাদের বলা হয় চাল শেষ। এতে অনেকেই পণ্য না কিনেই ফিরে যেতে বাধ্য হন।
ভোক্তাদের অভিযোগ, দুই বাজার পর পরই ডিলারদের পক্ষ থেকে খাবার বিরতির কথা বলে বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর লাইনে থাকা মানুষজন একে একে চলে গেলে ডিলারদের সংশ্লিষ্ট ট্রাক দুটি দ্রুত স্থান ত্যাগ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় ওএমএস কার্যক্রমের তদারকির দায়িত্বে থাকা রায়হান ইবনে হোসেন ও মাজেদা খাতুনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিষয়টি এআরও মো. আনোয়ার হোসেনকে জানানো হলে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না বলে দাবি করেন। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে ডিলার মো. রাসেল আহমেদের ভাড়াটিয়া বিক্রেতা হিসেবে পরিচয় দেওয়া জসিমের বক্তব্যে আরও গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। তিনি দাবি করেন, ওএমএস কার্যক্রম পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট তদারককারীদের নিয়মিত অর্থ দিতে হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তদারককারীরা ২ হাজার টাকা এবং এআরও ৩ হাজার টাকা করে নেন।
জসিমের অভিযোগ, এসব অর্থ না দিলে তাদের পক্ষে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, সাধারণ ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী সব চাল ও আটা বিক্রি হয় না। ফলে নির্ধারিত পদ্ধতির বাইরে পণ্য সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
তিনি আরও দাবি করেন, ‘এদিক-সেদিক’ না করলে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। তবে তার এসব বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট তদারককারী ও কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ওএমএস কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো নিম্নআয়ের ও দরিদ্র মানুষের কাছে তুলনামূলক কম দামে খাদ্যপণ্য পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে বাজারে চাল-আটার দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেলে ওএমএসের মাধ্যমে নির্ধারিত দামে খাদ্যপণ্য বিক্রি দরিদ্র মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে কাজ করে।
কিন্তু নির্ধারিত স্থানে পর্যাপ্ত পণ্য থাকার পরও যদি সাধারণ ভোক্তাদের ‘পণ্য শেষ’ বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে কর্মসূচির উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি বরাদ্দের পণ্য নির্ধারিত ভোক্তাদের কাছে না পৌঁছে অন্যত্র বা বেশি দামে বিক্রি করা হলে তা তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
স্থানীয় ভোক্তাদের দাবি, ওএমএসের প্রতিটি ট্রাকে কত পরিমাণ চাল ও আটা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, কতটুকু বিক্রি হয়েছে এবং অবিক্রীত পণ্য কোথায় নেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ্যে আনা দরকার। একই সঙ্গে বিক্রির সময়, ভোক্তার উপস্থিতি, বিক্রিত পণ্যের পরিমাণ এবং দিনের শেষে অবশিষ্ট পণ্যের হিসাব নিয়মিত যাচাই করা হলে অনিয়মের সুযোগ কমবে বলে মনে করছেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে ডিলার মো. রাসেল আহমেদ ও মো. জাফর আহমেদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে তদারককারী রায়হান ইবনে হোসেন, মাজেদা খাতুন এবং এআরও মো. আনোয়ার হোসেনের কাছ থেকেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
এদিকে ভোক্তারা বলছেন, ওএমএসের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মসূচিতে কোনো ধরনের অনিয়ম, পণ্য মজুত বা নির্ধারিত মূল্যের বাইরে বিক্রির অভিযোগ থাকলে তা দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত চাল-আটা যাতে প্রকৃত ভোক্তাদের কাছেই পৌঁছে, তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।