স্টাফ রিপোর্টার:
রাজধানীর ডি-৪ রেশনিং এলাকার কামরাঙ্গীরচর ও শহীদবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় সরকারের ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম, ডিলার নিয়োগে কারচুপি, ঘুষ লেনদেন এবং তদারকির ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে ওএমএসের ডিলার নিয়োগ ও পণ্য বিতরণ কার্যক্রম। ফলে সরকারের সুলভ মূল্যের চাল-আটা প্রকৃত নিম্নআয়ের মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ছাত্র নেতাদের পক্ষে মো. জুয়েল নামের এক ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া অভিযোগে এসব অনিয়মের বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। অভিযোগে ডি-৪ এলাকার পাশাপাশি ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন রেশনিং এলাকাতেও একই ধরনের অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ডি-৪ এলাকার কামরাঙ্গীরচর ও শহীদবাগের অনেক ওএমএস দোকান নিয়মিত খোলা হয় না। কোনো কোনো দোকান খুললেও অল্প সময় কার্যক্রম পরিচালনার পর বন্ধ করে দেওয়া হয়। তদারকি কর্মকর্তা, এলাকা রেশনিং কর্মকর্তা (এআরও) ও প্রধান নিয়ন্ত্রক, ঢাকা রেশনিং (সিসিডিআর) পর্যায় থেকে যথাযথ নজরদারি না থাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ওএমএস ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। শুধু ডি-৪ নয়, ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন রেশনিং এলাকাতেই একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, অতীতে দায়িত্বে থাকা কিছু ডিলার নাম পরিবর্তন করে কিংবা নতুন নামে আবারও ডিলারশিপ পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এতে সংশ্লিষ্ট অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। লটারির মাধ্যমে ডিলার নিয়োগের কথা থাকলেও পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ছিল না বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অনেক যোগ্য আবেদনকারীকে লটারিতে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরিয়ে কিছু আবেদনকারীকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে দাবি করা হয়, লটারির বাক্সে নির্বাচিত আবেদনকারীদের টোকেন আগে থেকেই রাখার মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি প্রভাবিত করা হয়েছে। এর ফলে এক এলাকার আবেদনকারীর নাম অন্য এলাকার লটারিতেও দেখা গেছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।
ওএমএস ডিলার নিয়োগে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, একটি পরিবারের দুই বা তারও বেশি সদস্য ডিলারশিপ পেয়েছেন। কোথাও কোথাও একই পরিবারের ৫-৬ জন সদস্য কীভাবে ডিলারশিপ পাওয়ার সুযোগ পেলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী। এ ধরনের নিয়োগের ক্ষেত্রে এআরও ও সিসিডিআরের ভূমিকা নিয়েও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য, আবেদন যাচাই, যোগ্যতা নির্ধারণ ও লটারির পুরো প্রক্রিয়া কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে যথাযথ যাচাই-বাছাই হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগে ডি-৪ এলাকার কয়েকজন কর্মকর্তা ও ডিলারের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, ডিলার কায়েস উদ্দিন আহমেদ (ক্রমিক-১২) খাদ্য পরিদর্শক মো. হোসেন মামুনের সহোদর ভাই। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ওই কর্মকর্তা তার ভাইকে ডিলারশিপ পাইয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং পরবর্তীতে তার প্রভাব কাজে লাগিয়ে ওএমএসের চাল ও আটা প্রকৃত হতদরিদ্রদের মধ্যে যথাযথভাবে বিতরণ করা হয়নি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ডিলারের বক্তব্য অভিযোগপত্রে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগে ডি-৪ এলাকার এআরও তারিকুজ্জামানের শ্যালক জনাব হাদী ইমরুল, উপ-খাদ্য পরিদর্শকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এআরও তারিকুজ্জামানের নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে হাদী ইমরুল ডিলার আরিফুল ইসলাম, মীর রানু বেগম ও মো. রমিজউদ্দিনের কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন। এছাড়া হাদী ইমরুলের মা মরিয়ম বেগমের নামে ডিলারশিপ নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, শুধু ডি-৪ নয়, বিভিন্ন রেশনিং এলাকায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে ডিলারশিপ দেওয়ার ঘটনা রয়েছে। কিছু ডিলারের আবেদনপত্রে ত্রুটি থাকার পাশাপাশি বাস্তবে দোকান না থাকার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, কোনো কোনো ডিলার এক এলাকার ডিলারশিপ নিয়ে অন্য এলাকায় দোকান কিংবা ট্রাকসেল পরিচালনা করছেন। আবার কেউ কেউ ডিলারশিপ এককালীন বা মাসিক ভিত্তিতে অন্যের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
ওএমএসের ট্রাকসেল ও দোকান পরিচালনার ক্ষেত্রেও ঘুষ লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে দাবি করা হয়, ট্রাকসেলের জন্য তদারকি কর্মকর্তাকে ২ হাজার টাকা, অফিসে ২ হাজার টাকা এবং গোডাউনে আরও ২ হাজার টাকা দিতে হয়। দোকানের ক্ষেত্রে অফিস ও গোডাউনে পৃথকভাবে ৩ হাজার টাকা করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে অভিযোগপত্রের সঙ্গে কোনো নথি বা প্রমাণ সংযুক্ত আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। অভিযোগে সাব্বির আহমেদ মুরাদ ও জাহাঙ্গীর আলম নামের দুই কর্মকর্তাকে প্রধান দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
ওএমএস নীতিমালা অনুযায়ী বিভাগীয় কমিশনারকে ডিলার নিয়োগ কার্যক্রমের সভাপতি এবং সংশ্লিষ্ট কমিটিকে ওএমএস পয়েন্ট নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, অনেক ক্ষেত্রে এআরও ও তদারকি কর্মকর্তারা নিজেদের ইচ্ছামতো ওএমএস পয়েন্ট নির্ধারণ করেছেন। পরবর্তীতে ডিলারের সুবিধা কিংবা তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে পয়েন্ট পরিবর্তন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে ওএমএস কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, কোনো কোনো তদারকি কর্মকর্তা ওএমএস দোকান খোলার সময় ১০-১২ জন মানুষকে নিয়ে ভিডিও ধারণ করেন। এরপর দোকানের আশপাশে বা পাশের দোকানে চাল-আটা মজুদ করে কিংবা সরকারি গুদাম থেকে কম পরিমাণ চাল-আটা এনে বিক্রির কার্যক্রম দেখানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এসব বিষয়ে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো কোনো কর্মকর্তা ডিলারের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে ব্যবস্থা না নিয়ে বরং তাকে অন্যভাবে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেন। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে দোকান বা পয়েন্টের ঠিকানা পরিবর্তন করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
ওএমএসের মতো একটি জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে এ ধরনের অভিযোগের কারণে নিম্নআয়ের মানুষের সরকারি সুবিধা পাওয়ার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগকারীর দাবি। অভিযোগে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের নিয়োগ বাতিল, সিসিডিআরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং এআরওদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে তদারকি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও প্রয়োজনে বদলির দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগকারীর মতে, ওএমএস কার্যক্রমকে অনিয়ম, দুর্নীতি ও কালোবাজারিমুক্ত করতে হলে ডিলার নিয়োগ থেকে শুরু করে পণ্য উত্তোলন, পরিবহন, বিক্রয় এবং তদারকি—প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ডিলারদের দোকান বাস্তবে আছে কি না, তারা নির্ধারিত এলাকায় পণ্য বিক্রি করছেন কি না এবং সরকারি বরাদ্দের চাল-আটা প্রকৃত ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না—তা নিয়মিতভাবে যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে।