মো. রাসেল:
বান্দরবানের লামা উপজেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) প্রকল্পের কাজ না করেই বরাদ্দের সম্পূর্ণ টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার ৭ নম্বর ফাইতং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. ময়নুল ইসলাম (শিমুল)-এর পরোক্ষ যোগসাজশে এই জালিয়াতি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দারা। এ বিষয়ে লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগপত্র সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীনে ফাইতং ইউনিয়নের নয়াপাড়া এলাকার হাসানের দোকানের পাশে একটি ‘গণ-শৌচাগার’ নির্মাণের জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। উক্ত প্রকল্পের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ফাইতং ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের নির্ধারিত স্থানে কোনো ধরনের কাজই করা হয়নি। এমনকি সীমানা নির্ধারণ কিংবা ইটের গাঁথুনিও দেওয়া হয়নি। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহেলা ও পরোক্ষ যোগসাজশে প্রকল্পের সম্পূর্ণ চূড়ান্ত বিল উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
অভিযোগে আরও বলা হয়, পরবর্তীতে এই অনিয়ম ও কথিত জালিয়াতি ধামাচাপা দিতে স্থানীয় ‘সুতাবাদি বাইতুন নূর জামে মসজিদ’-এর দেওয়ালে উক্ত গণ-শৌচাগার প্রকল্পের সরকারি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়। পবিত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দেওয়ালে এমন সাইনবোর্ড দেখে মুসল্লি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর জালিয়াতি ফাঁসের আশঙ্কায় মাত্র একদিনের মাথায় রাতের আঁধারে সাইনবোর্ডটি সেখান থেকেও সরিয়ে ফেলা হয়।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, দায়িত্বশীল তদারকি কর্মকর্তা হিসেবে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. ময়নুল ইসলাম (শিমুল) মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে প্রকল্প পরিদর্শন না করেই কথিত ভুয়া প্রকল্পের ফাইল ও মাস্টাররোল অনুমোদন করেছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ঘটনায় তাঁর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অবহেলা ও রহস্যজনক ভূমিকার বিষয়টি তদন্ত করা প্রয়োজন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফাইতং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক। তাঁর বিরুদ্ধে আনা আর্থিক অনিয়ম ও টাকা আত্মসাতের অভিযোগকে তিনি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। রাজনৈতিকভাবে তাকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য একটি মহল মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে প্রকল্পের নিয়ম মেনেই কাজ করা হয়েছে বলে দাবি করেন চেয়ারম্যান।
অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. ময়নুল ইসলাম (শিমুল)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরে তিনি বলেন, “আমি এ বিষয়ে এখন কোনো কথা বলতে চাচ্ছি না। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে টাকা ফেরত নেওয়াসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে সরকারি অর্থের কথিত অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগের পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দেওয়ালে সরকারি প্রকল্পের সাইনবোর্ড টাঙানোর বিষয়টি নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
এলাকাবাসী বলছেন, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা, বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন, বিল-ভাউচার, মাস্টাররোল এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, প্রকল্পের কাজে অনিয়ম বা সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনা প্রমাণিত হলে আত্মসাৎ করা অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত নেওয়ার পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।