কাজ শেষ হওয়ার আগেই ধসে পড়ল শত কোটি টাকার মাতামুহুরী নদী রক্ষা বাঁধ

স্টাফ রিপোর্টার:

বান্দরবানের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র লামা বাজার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মাতামুহুরী নদীর ভাঙন থেকে রক্ষা করতে সরকারের ব্যয় করা শত কোটি টাকার মেগা প্রকল্প ভেস্তে যেতে বসেছে। প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই নবনির্মিত সিসি ব্লকের প্রতিরক্ষামূলক বাঁধে ভয়াবহ ধস ও দীর্ঘ ফাটল দেখা দিয়েছে।

গত ৭ জুন (২০২৬) সামান্য বৃষ্টিপাতেই বাঁধের এই কঙ্কালসার রূপ প্রকাশ পায়। অথচ শত কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দের এই অনিয়ম ও কাজের নিম্নমান নিয়ে প্রশ্ন তোলায় স্থানীয়দের কোনো সদুত্তর দেয়নি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্তরা; উল্টো তারা গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এড়িয়ে গেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লামা বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রমত্তা মাতামুহুরী নদীর ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে শত কোটি টাকা ব্যয়ে সিসি ব্লক দিয়ে এই স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই মেগা প্রকল্প অনুমোদন হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছিল লামাবাসীর মনে। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার আগেই বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় সেই স্বস্তি এখন চরম আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বাঁধের কাজ এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। এরই মধ্যে একটি বড় অংশের সিসি ব্লকগুলো সারিবদ্ধভাবে ধসে নিচের দিকে দেবে গেছে। ব্লকগুলোর মাঝখানে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ ও গভীর ফাটল। বাঁধের নিচের মাটি সরে যাওয়ায় ব্লকগুলো আলগা হয়ে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজের শুরু থেকেই নির্মাণ সামগ্রীর নিম্নমান এবং সঠিক নিয়মে নদীর তলদেশে পাইলিং বা জিও-টেক্সটাইল ফিল্টার না বসিয়ে তাড়াহুড়ো করে ব্লক সাজানোর কারণেই সামান্য বৃষ্টির পানিতেই এই ধসের সৃষ্টি হয়েছে।

এই ভাঙন ও কাজের মান নিয়ে কথা বলতে গত ৭ জুন ধসের পরপরই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে চাননি। বাঁধ ধসে পড়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি ক্ষুব্ধ হন এবং কোনো প্রকার সদুত্তর না দিয়ে তড়িঘড়ি করে স্থান ত্যাগ করেন। ঠিকাদার পক্ষের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ ও গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলার ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের মনে ক্ষোভ আরও দানা বেঁধে উঠেছে।

লামা বাজারের ব্যবসায়ীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের বাজার ও ঘরবাড়ি রক্ষার জন্য সরকার শত কোটি টাকা বরাদ্দ দিল। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার আগেই সামান্য বৃষ্টিতে যদি বাঁধ এভাবে ভেঙে যায়, তবে বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বাড়লে পুরো বাজার নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। কোটি কোটি টাকার এই অনিয়ম দেখার এবং জবাবদিহি চাওয়ার যেন কেউ নেই!”

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি, দুর্নীতি এবং সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্মকর্তাদের উদাসীনতার কারণেই সরকারের এই মহতী উদ্যোগ আজ ভেস্তে যাওয়ার মুখে। কাজ চলমান থাকা অবস্থায় এই ভাঙন প্রমাণ করে যে বাঁধের স্থায়িত্ব অত্যন্ত দুর্বল এবং এতে চরম অনিয়ম হয়েছে।

সামনে পুরোদমে বর্ষা মৌসুম শুরু হতে যাচ্ছে। তার আগেই এই বাঁধের ধস ঠেকাতে না পারলে লামা বাজারের শত শত দোকানপাট ও বসতবাড়ি নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এ বিষয়ে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত সাপেক্ষে দোষী ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে বাঁধটি পুনঃনির্মাণ ও টেকসই সংস্কারের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন লামার সর্বস্তরের মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *