কাবিনের টাকা আত্মসাত থেকে সরকারি গাছ কর্তন, ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে তিন অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

নড়াইলের কালিয়া উপজেলার ৫ নম্বর সালামাবাদ ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. জোনায়েদ শরীফের বিরুদ্ধে কাবিন ও খোরপোশের অর্থের অংশ আত্মসাত, সরকারি গাছ কর্তন ও বিক্রি এবং ডিপ টিউবওয়েল দেওয়ার নামে অর্থ গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে পৃথক তিনটি লিখিত অভিযোগ ও আবেদন জমা দিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা।

আবেদনকারীরা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

সর্বশেষ গত ১৭ জুন ভুক্তভোগী রাবেয়া কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, পারিবারিকভাবে সালামাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. সুমনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। পরবর্তীতে দাম্পত্য কলহের জেরে প্রায় দুই বছর আগে স্থানীয়ভাবে অনুষ্ঠিত সালিশের মাধ্যমে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ (তালাক) সম্পন্ন হয়।

রাবেয়ার অভিযোগ, ওই সালিশে মধ্যস্থতা করেন সালামাবাদ ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. জোনায়েদ শরীফ। সালিশে উভয় পক্ষের সম্মতিতে কাবিন ও খোরপোশ বাবদ মোট ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে তার সাবেক স্বামী পুরো ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ইউপি সদস্য মো. জোনায়েদ শরীফের কাছে প্রদান করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে রাবেয়া আরও দাবি করেন, ইউপি সদস্য তাকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রদান করেন। বাকি ৩০ হাজার টাকা পরে তার সাবেক স্বামী পরিশোধ করবেন বলে তাকে জানানো হয়। কিন্তু পরবর্তীতে সাবেক স্বামীর কাছে ওই টাকা চাইলে তিনি জানান, পুরো ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা আগেই ইউপি সদস্যের কাছে দেওয়া হয়েছে।

এরপর রাবেয়া ইউপি সদস্যের কাছে বাকি ৩০ হাজার টাকা চাইলে তিনি সালিশের খরচের কথা উল্লেখ করে ওই অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানান বলে অভিযোগ করেন রাবেয়া। তার দাবি, কাবিন ও সন্তানের ভরণপোষণের জন্য প্রাপ্য অর্থের একটি অংশ থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন।

রাবেয়া বলেন, তিনি একজন অসহায় নারী। দীর্ঘদিন ধরে নিজের ন্যায্য পাওনা আদায়ের চেষ্টা করেও সফল হননি। পরে বাধ্য হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেছেন। তিনি অভিযোগটি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন, তার প্রাপ্য অর্থ আদায় এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

সরকারি গাছ কর্তনের অভিযোগ

এদিকে, গত ২৮ জুন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা কালিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর পৃথক একটি লিখিত আবেদন করেন। এতে ইউপি সদস্য মো. জোনায়েদ শরীফের বিরুদ্ধে সরকারি মালিকানাধীন গাছ কেটে বিক্রি করার অভিযোগ করা হয়।

আবেদনকারীদের দাবি, সরকারি সম্পত্তির আওতাধীন গাছ কর্তন করে বিক্রি করার ঘটনায় সরকারি সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। বিষয়টি জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

অভিযোগে আরও বলা হয়, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। আবেদনের সঙ্গে কর্তন করা গাছের গুঁড়ির ছবিও সংযুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ডিপ টিউবওয়েল দেওয়ার নামে ৯ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ

অন্যদিকে, একই উপজেলার বাকা গ্রামের বাসিন্দা মো. মাসুদুর শিকদার গত ১৭ জুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আরেকটি লিখিত অভিযোগ দেন। এতে তিনি অভিযোগ করেন, প্রায় চার বছর আগে ডিপ টিউবওয়েল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইউপি সদস্য মো. জোনায়েদ শরীফ তার কাছ থেকে নগদ ৯ হাজার টাকা গ্রহণ করেন।

মাসুদুর শিকদারের অভিযোগ, টাকা নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় পার হলেও তাকে কোনো ডিপ টিউবওয়েল সরবরাহ করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার তাগাদা দেওয়া হলেও ইউপি সদস্য টাকা ফেরত দেননি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওই আবেদনে মাসুদুর শিকদার প্রশাসনের কাছে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাকে ডিপ টিউবওয়েল সরবরাহ অথবা গ্রহণ করা ৯ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন।

তদন্তের দাবি

একই ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি লিখিত অভিযোগ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে জমা পড়ায় স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, সরকারি সম্পদ রক্ষা, সাধারণ মানুষের অর্থের নিরাপত্তা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার স্বার্থে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ইউপি সদস্য মো. জোনায়েদ শরীফের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *