আবু সুফিয়ান:
ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার শাক্তা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যেরচর মৌজায় রাতের আঁধারে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু ফেলে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি ভরাট করে দখলের পাঁয়তারার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দক্ষিণ বালুর চর গ্রামের মধুসিটি রিভারভিউয়ের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে কয়েকটি ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে জমির মালিকদের অনুমতি ছাড়াই বালু ফেলে ভরাটের কাজ চালানো হচ্ছে।
এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ও ভুক্তভোগী জমির মালিক এবং স্থানীয় এলাকাবাসী সোমবার (৩১ আগস্ট) সকাল আনুমানিক ৯টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনে তারা জমি দখলের অভিযোগ তদন্ত, অবৈধভাবে বালু ভরাট বন্ধ এবং প্রকৃত জমির মালিকদের মালিকানা ও দখল সুরক্ষার দাবি জানান।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, কেরানীগঞ্জের শাক্তা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যেরচর মৌজায় ‘মধু হাজী রিভার ভিউ’ বা ‘মধুসিটি রিভারভিউ’ নামে একটি আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে মালিকদের অনুমতি ছাড়াই বালু ফেলে জমির আকৃতি ও সীমানা পরিবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দিনের বেলায় স্থানীয়দের বাধার কারণে বালু ভরাটের কাজ বন্ধ হয়ে গেলেও পরে রাতের আঁধারে ড্রেজার এনে দ্রুতগতিতে জমিতে বালু ফেলার কাজ শুরু করা হয়। রাতের অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে বিপুল পরিমাণ বালু ফেলে জমি ভরাট করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মধ্যেরচর মৌজার দক্ষিণ বালুর চর এলাকায় মধুসিটি রিভারভিউয়ের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে একটি জমিতে প্রথমে দিনের বেলায় বালু ভরাটের কাজ শুরু হয়। বিষয়টি জানতে পেরে জমির মালিক ও স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে গিয়ে বাধা দেন। তাদের প্রতিবাদের মুখে তখন কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কয়েক দিন পর স্থানীয়দের নজর এড়িয়ে রাতের বেলায় আবারও ড্রেজার এনে ওই জমিতে বালু ফেলার কাজ শুরু করা হয় বলে অভিযোগ।
রাতের আঁধারে দ্রুত জমি ভরাটের অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, রাতের বেলায় ড্রেজারের মাধ্যমে দ্রুত বিপুল পরিমাণ বালু ফেলে জমি ভরাট করা হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এভাবে জমির ভৌত অবস্থা ও সীমানা পরিবর্তন করে ধীরে ধীরে জমি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীরা বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জমি থাকলেও অন্যের মালিকানাধীন জমিতে মালিকের অনুমতি ছাড়া বালু ফেলে ভরাট করার সুযোগ নেই। কিন্তু মধ্যেরচর মৌজায় এমন ঘটনা ঘটছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, দিনের বেলায় শ্রমিক ও ড্রেজার দিয়ে বালু ভরাটের কাজ শুরু করা হলে স্থানীয়রা বাধা দেন। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলে রাতের বেলায় পুনরায় কাজ শুরু করার অভিযোগ ওঠে। এতে জমির প্রকৃত মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
একজন ভুক্তভোগী বলেন, “জমিতে বালু ভরাটের কাজ শুরু হলে আমরা বাধা দিয়েছিলাম। তখন কাজ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু পরে রাতের বেলায় ড্রেজার এনে দ্রুত জমি ভরাট করা হয়েছে। আমরা চাই প্রশাসন ঘটনাস্থলে এসে তদন্ত করুক এবং জমির প্রকৃত মালিকানা ও ভরাটের বৈধতা যাচাই করুক।”
মানববন্ধনে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী মহল বিভিন্নভাবে তাদের জমি দখলের চেষ্টা করছে। তারা দাবি করেন, অতীতে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রভাব বিস্তার করেছিল। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হলেও তাদের কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন সাধারণ মানুষের জমি দখল করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা প্রয়োজন। তারা বলেন, জমির মালিকরা তাদের বৈধ কাগজপত্র নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জমি ভোগদখল করে আসছেন। হঠাৎ করে রাতের আঁধারে ড্রেজার এনে বালু ফেলে জমি ভরাটের কারণে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
তাদের দাবি, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে জমির প্রকৃত মালিকদের জমি রক্ষায় প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগে মধুসিটি রিভারভিউয়ের মো. আমিন, নূরুল ইসলাম (ভেন্ডর), মো. মামুনসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। এছাড়া মো. আমিন, পিতা—মৃত হাজী মধু; আনিছুর রহমান (কুদ্দুস), পিতা—বাচ্চু মিয়া; মো. মামুন, পিতা—হাবিব মিয়া; মো. খালেক, পিতা—বাদশা মিয়া; শরিফ, পিতা—মৃত করম আলী এবং ফারুক, পিতা—আলী মিয়াসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে জমি দখলের চেষ্টায় জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে ওঠা দাবির বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের বক্তব্য প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
জমির মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে অনুমতি ছাড়া বালু ফেলে ভরাট করা হলে ভবিষ্যতে জমির সীমানা ও মালিকানা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে জমির প্রকৃত অবস্থা পরিবর্তিত হওয়ায় পরবর্তীতে জমি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
ভুক্তভোগীরা আরও বলেন, জমির মালিকদের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা বা অনুমতি ছাড়া যদি বালু ফেলে জমি ভরাট করা হয়, তাহলে তা শুধু জমির মালিকের ক্ষতিই নয়, এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি বিরোধেরও কারণ হতে পারে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে সংঘাত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কাও করছেন তারা।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় এলাকাবাসীর দাবি, কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন, ভূমি অফিস এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করুন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জমির খতিয়ান, দলিল, নামজারি, দখল ও সীমানা যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তারা আরও দাবি করেন, মধুসিটি রিভারভিউয়ের নামে বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে ওই এলাকায় যে জমি ভরাটের কাজ চলছে, তার বৈধতা ও অনুমোদন রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন। কোনো অনুমোদন ছাড়া অথবা অন্যের মালিকানাধীন জমিতে বেআইনিভাবে বালু ফেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
ভুক্তভোগীরা বলেন, “আমরা কোনো রাজনৈতিক সুবিধা চাই না। আমরা আমাদের জমির নিরাপত্তা চাই। জমির কাগজপত্র যাচাই করে প্রকৃত মালিকের জমি প্রকৃত মালিকের কাছে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। রাতের আঁধারে ড্রেজার এনে জমি ভরাটের মতো কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে।”
দীর্ঘদিনের বিরোধের অভিযোগ
স্থানীয়দের দাবি, মধ্যেরচর মৌজার ওই এলাকায় জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ধরনের বিরোধ ও অভিযোগ রয়েছে। একটি আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও করেছেন তারা।
তাদের অভিযোগ, প্রথমে বিভিন্নভাবে জমির মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে জমিতে বালু ফেলার চেষ্টা করা হয়। স্থানীয়রা বাধা দিলে দিনের বেলায় কাজ বন্ধ রাখা হলেও পরে রাতের বেলায় আবারও বালু ভরাটের কাজ চালানোর অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে আবেগ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে কাগজপত্র ও সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করা জরুরি। কার জমি, কার মালিকানা এবং কার অনুমতিতে জমি ভরাট করা হচ্ছে—এসব বিষয় যাচাই করলেই অভিযোগের সত্যতা স্পষ্ট হবে।
প্রকৃত ঘটনা তদন্তের দাবি
ভুক্তভোগীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে দ্রুত তদন্তের দাবি উঠেছে। স্থানীয়রা বলছেন, জমি ভরাটের কাজ চলমান থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিতর্কিত জমিতে বালু ভরাটের কার্যক্রম বন্ধ রাখার বিষয়েও প্রশাসনের নজর দেওয়া প্রয়োজন।
তাদের দাবি, প্রশাসন সরেজমিনে গিয়ে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু ভরাটের অভিযোগ তদন্ত করুক, জমির মালিকদের কাগজপত্র পরীক্ষা করুক এবং প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করুক। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
মানববন্ধন থেকে ভুক্তভোগীরা আরও বলেন, সাধারণ মানুষের ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি রক্ষায় প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা না থাকলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে। তাই দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে জমি দখলের অভিযোগের তদন্ত, অবৈধ বালু ভরাট বন্ধ এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
এদিকে, স্থানীয়দের উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা, জমির মালিকানা এবং বালু ভরাটের বৈধতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই এখন ভুক্তভোগীদের প্রধান দাবি।