খুলনায় খাদ্য অধিদপ্তরকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ—অফিস আদেশে নতুন বিতর্ক

মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন:

খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে গত ১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জারি করা দুটি পৃথক অফিস আদেশ ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে খাদ্য অধিদপ্তরের কার্যক্রম। স্থানীয় প্রশাসনিক মহল ও সুশীল সমাজের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। আদেশ দুটি পর্যালোচনা করে ধারণা করা হচ্ছে, সরকারি খাদ্যশস্য বিতরণ ব্যবস্থায় বিদ্যমান অনিয়ম ও অসংগতি এখন আর আড়ালে নেই, বরং তা প্রকাশ্যে এসেছে এবং প্রশাসন বাধ্য হয়েছে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা জারি করতে।

প্রথম আদেশে বলা হয়েছে, কিছু এলাকায় বিতর্কিত স্লোগান সংবলিত বস্তায় সরকারি খাদ্যশস্য বিতরণ করা হচ্ছে, যা সরকারি নীতিমালার পরিপন্থী। সাধারণভাবে সরকারি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে ব্যবহৃত বস্তায় নির্দিষ্ট লোগো ও পরিচিতি ছাড়া কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা বিতর্কিত বার্তা থাকার কথা নয়। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এমন অনিয়ম ধরা পড়ায় বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে গুরুত্ব পায়। এ ধরনের ঘটনা সরকারি কার্যক্রমের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

দ্বিতীয় আদেশে আরও গুরুতর একটি অভিযোগ উঠে এসেছে, তা হলো ওজনে কম খাদ্যশস্য বিতরণ। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে যে, ৫০ কেজির বস্তায় প্রকৃতপক্ষে ৪৭ থেকে ৪৮ কেজি খাদ্যশস্য সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে একদিকে সরকার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা তাদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, পরিবহন ও ডিলার পর্যায়ের কিছু অসাধু চক্র ইচ্ছাকৃতভাবে এই ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত।

বিশ্লেষকদের মতে, একই সময়ে দুটি পৃথক অফিস আদেশ জারি হওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি ইঙ্গিত দেয় যে সমস্যাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিস্তৃত। একজন সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, যখন কোনো বিষয়ে অফিস আদেশ জারি করতে হয়, তখন বোঝা যায় সমস্যা অনেক আগেই গুরুতর আকার ধারণ করেছে। ফলে এখন নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য অধিদপ্তরকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ওজনে কম দেওয়া, নিম্নমানের খাদ্যশস্য বিতরণ, ডিলার সিন্ডিকেট, টেন্ডার দুর্নীতি এবং ভুয়া কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা আত্মসাৎ। বিশেষ করে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ভিজিডি এবং ওএমএস কার্যক্রমে এসব অনিয়মের অভিযোগ বেশি পাওয়া যায়।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, কিছু ডিলার সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সরকারি খাদ্যশস্যের একটি অংশ অবৈধভাবে বাজারে বিক্রি করে দেয়। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং বাজারে দামের অস্থিরতা দেখা দেয়। একই সঙ্গে নিম্নআয়ের মানুষ যারা এই সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, তারা প্রকৃত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।

নিম্নমানের খাদ্যশস্য বিতরণের অভিযোগও নতুন নয়। অনেক ক্ষেত্রে ভেজা, পোকাধরা বা অখাদ্যযোগ্য চাল বা গম বিতরণের অভিযোগ পাওয়া যায়। এতে ভোক্তারা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়েন এবং সরকারি সহায়তার প্রতি আস্থা কমে যায়।

অন্যদিকে ভুয়া কার্ড ও তালিকা জালিয়াতির মাধ্যমে খাদ্যশস্য আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহায়তায় মৃত ব্যক্তি বা অযোগ্য ব্যক্তির নামে কার্ড তৈরি করে সরকারি বরাদ্দ তুলে নেওয়ার অভিযোগ অতীতে একাধিকবার সামনে এসেছে।

খুলনার সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, সরকারি সহায়তা কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। একজন ভিজিডি কার্ডধারী বলেন, তারা যে চাল পান তা অনেক সময় নিম্নমানের এবং পরিমাণেও কম থাকে, ফলে তাদের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, অনিয়ম রোধে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। তবে মাঠ পর্যায়ে জনবল সংকট, প্রশাসনিক চাপ এবং স্থানীয় প্রভাবের কারণে সবসময় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়তে হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা, ওজন পরিমাপ যন্ত্র আধুনিকীকরণ এবং ডিলার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা জরুরি। পাশাপাশি নিয়মিত অডিট এবং কঠোর তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের সক্রিয় ভূমিকা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অতীতে কিছু অভিযানে অনিয়ম ধরা পড়লেও তা ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ না করায় সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।

খুলনার ১২ এপ্রিলের দুটি অফিস আদেশ তাই কেবল প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়, বরং একটি বড় ব্যবস্থাগত সমস্যার প্রতিফলন। এখন দেখার বিষয় হলো, এই নির্দেশনার বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর হয় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কতটা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।

সংশ্লিষ্ট মহল আরও বলছে, খাদ্য অধিদপ্তরের এই ধরনের অনিয়ম শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতার ফল নয়, বরং দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সমস্যা। স্থানীয় পর্যায়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও ডিলারদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই চক্রটি বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করে সরকারি খাদ্যশস্যের একটি অংশ অবৈধভাবে সরিয়ে নেয়।

এছাড়া মাঠ পর্যায়ের তদারকি ব্যবস্থাও যথেষ্ট দুর্বল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নিয়মিত মনিটরিং থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তবে গুদাম, পরিবহন এবং বিতরণ পর্যায়ে সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না হওয়ায় অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, খাদ্য অধিদপ্তরের কার্যক্রমে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন জরুরি। প্রতিটি খাদ্যশস্য বিতরণ প্রক্রিয়া ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা গেলে ওজন, গুণগত মান এবং বিতরণের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বর্তমানে হাতে-কলমে ব্যবস্থাপনার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তথ্য গোপনের সুযোগ থেকে যায়।

অন্যদিকে সাধারণ জনগণের মধ্যে সচেতনতার অভাবও এই অনিয়মকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করছে। অনেক সুবিধাভোগী জানেন না তাদের কতটুকু খাদ্যশস্য পাওয়ার কথা, ফলে তারা কম পেলেও অভিযোগ করেন না। এই সুযোগে অসাধু চক্র আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে।

সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন সময় সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে ডিলার নিয়োগ, গুদাম ব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন খাতে স্বচ্ছতা আনার বিষয়ে একাধিক সুপারিশ থাকলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

খুলনার সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই ধরনের ঘটনা যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তাহলে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, শুধু নির্দেশনা জারি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত অভিযান, কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। অন্যথায় একই ধরনের অনিয়ম বারবার ফিরে আসবে।

অন্যদিকে সামাজিক সংগঠনগুলোও এই বিষয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে অনিয়ম অনেকাংশে কমে আসতে পারে।

সামগ্রিকভাবে খুলনার এই ঘটনা খাদ্য অধিদপ্তরের কার্যক্রমে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রশাসন, জনগণ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শেষ পর্যন্ত বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে, খাদ্য অধিদপ্তরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সরকারি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি দরিদ্র মানুষের জীবনরেখা হিসেবে কাজ করে, তাই এখানে সামান্য অনিয়মও বড় সামাজিক প্রভাব ফেলতে পারে। যদি দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে এই অনিয়ম ভবিষ্যতে আরও গভীর সংকট তৈরি করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তা ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এই পরিস্থিতিতে দ্রুত তদন্ত, দোষীদের চিহ্নিতকরণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হলে তবেই জনআস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে এবং ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে বলছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এবং প্রশাসনিক মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *