খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ: খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গভীর সংকটের আশঙ্কা

মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন:

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেশের অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও দুর্যোগ মোকাবিলার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। খাদ্যশস্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত না হলে এর প্রভাব পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জীবনে। এই ব্যবস্থার নীতিনির্ধারণী দায়িত্ব পালন করে খাদ্য মন্ত্রণালয়, বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করে খাদ্য অধিদপ্তর এবং সার্বিক অর্থায়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু খুলনা অঞ্চলে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোঃ মামুনুর রশীদের বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এই গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মোঃ মামুনুর রশীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন মহলে অসন্তোষ তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, যোগদানের অল্প সময়ের মধ্যেই বদলি ও পদোন্নতি কেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, গুদাম কর্মকর্তা, খাদ্য পরিদর্শক এমনকি নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের বদলির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ নির্ধারণ করা হয়েছে বলে দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা। পছন্দের উপজেলায় বদলির জন্য ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ শহরাঞ্চলে পদায়নের জন্য ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। পদোন্নতি বা অতিরিক্ত দায়িত্ব পেতেও আলাদা অর্থ লেনদেনের কথা শোনা যাচ্ছে। এই অর্থ সরাসরি গ্রহণ না করে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আদান-প্রদান করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।

ধান-চাল সংগ্রহ মৌসুমে অনিয়মের বিষয়টিও সামনে এসেছে। কৃষকদের কাছ থেকে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে ধান সংগ্রহের সময় কেজিপ্রতি অতিরিক্ত কমিশন আদায়, গুদামে পুরোনো বস্তা নতুন হিসেবে দেখিয়ে বিল উত্তোলন এবং ভুয়া ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, মিল মালিক ও গুদাম কর্মকর্তাদের জিম্মি করে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। একইভাবে ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) কার্যক্রমে ডিলারদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রদান এবং দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত চাল-আটা বাজারে বিক্রির ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। এতে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং বাজারে কৃত্রিম সংকটের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন।

খাদ্যশস্য সংরক্ষণ ব্যবস্থায়ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে দেশের সরকারি গুদাম ও সাইলোসমূহে প্রায় ১.৫ থেকে ২ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য সংরক্ষণের সক্ষমতা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ অবকাঠামো না থাকায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি হয়। ৮০ শতাংশ সংরক্ষণ সক্ষমতা অর্জনের যে লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা চলছে, তা বাস্তবায়নে আধুনিক সাইলো নির্মাণ, ডিজিটাল ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট, পরিবহন ট্র্যাকিং এবং কঠোর অডিট ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি অব্যাহত থাকলে এসব পরিকল্পনা কার্যকর হওয়া কঠিন হবে।

এদিকে দুর্নীতির বিষয়গুলো অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন প্রকাশের পর দৈনিক স্বাধীন সংবাদের সাংবাদিক জাহাঙ্গীর হোসেন হুমকি পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এছাড়া আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষার অভিযোগও সামনে এসেছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি এবং এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন-এর সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

খাদ্য নিরাপত্তা কেবল প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদি সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়, গুদাম ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকে এবং বিতরণ ব্যবস্থায় দুর্নীতি বিস্তার লাভ করে, তবে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী ভর্তুকিযুক্ত খাদ্য থেকে বঞ্চিত হয়, কৃষক ন্যায্য মূল্য পায় না এবং সরকারি তহবিল অপচয় হয়। খুলনা অঞ্চলে উত্থাপিত অভিযোগসমূহ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে জনআস্থা আরও ক্ষুণ্ণ হতে পারে। স্বচ্ছতা, ডিজিটালাইজেশন, জবাবদিহিতা এবং শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করার দাবি এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *