মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন:
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (খুমেক) হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে চলছে চরম অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। রক্ত, প্রস্রাব, টিস্যু, বায়োকেমিস্ট্রি, হেমাটোলজি ও সেরোলজিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় অস্বাভাবিক বিলম্ব, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, রিপোর্টে অসঙ্গতি এবং রোগীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগে ক্ষোভ বাড়ছে সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে। প্রতিদিন ভোর থেকে শত শত রোগী ও তাদের স্বজনরা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।
সম্প্রতি প্রাপ্ত ছবি ও সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্যাথলজি বিভাগের সামনে উপচে পড়া ভিড়। টোকেন কাউন্টারের সামনে ধাক্কাধাক্কি, চিৎকার-চেঁচামেচি এবং বিশৃঙ্খল পরিবেশে রোগী ও স্বজনদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেকেই সকাল ৬টা-৭টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও দুপুরের আগে টোকেন পান না। এক রোগীর স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সকাল থেকে দাঁড়িয়ে আছি। টোকেন পেতে পাঁচ ঘণ্টা লেগেছে। এখন বলছে রিপোর্ট পেতে দুই-তিন দিন লাগবে। রোগী ভর্তি, ডাক্তার রিপোর্ট চাচ্ছেন—এ অবস্থায় আমরা কী করবো?”
অতিরিক্ত ফি আদায় ও রিপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগ
রোগী ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, সরকারি নির্ধারিত ফি’র চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেশি অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রশিদ ছাড়াই টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একাধিক ভুক্তভোগী জানান, যন্ত্রপাতি নষ্ট বা কেমিক্যালের সংকট দেখিয়ে রোগীদের বাইরে নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হচ্ছে। অভিযোগ আছে, এ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্টদের কমিশন বাণিজ্য চলে।
এক রোগী বলেন, “রক্ত পরীক্ষার জন্য ৫০০ টাকা লাগার কথা, কিন্তু ১৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে মেশিন নষ্ট, বাইরে করতে হবে। পরে জানতে পারি মেশিন সচল ছিল।” অন্য একজন অভিযোগ করেন, তার রিপোর্টে মান পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে, পরে প্রাইভেট ল্যাবে পরীক্ষা করিয়ে ভিন্ন ফল পাওয়া যায়। এতে চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি রোগীর জীবনঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দালাল চক্র ও টোকেন বাণিজ্যের অভিযোগ
প্যাথলজি বিভাগের সামনে সক্রিয় দালাল চক্রের উপস্থিতির অভিযোগও নতুন নয়। রোগীদের দ্রুত টোকেন পাইয়ে দেওয়া, নির্দিষ্ট কক্ষে আগে প্রবেশের সুযোগ বা দ্রুত রিপোর্ট দেওয়ার আশ্বাসে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেক রোগী দাবি করেছেন, সাধারণ লাইনে দাঁড়ালে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়, কিন্তু দালালের মাধ্যমে গেলে তুলনামূলক দ্রুত সেবা মেলে।
দুদকের পূর্ববর্তী অভিযান ও গণশুনানি
খুমেক হাসপাতালে অনিয়মের বিষয়টি অতীতে একাধিকবার আলোচনায় এসেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর আগে বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করে হাসপাতালের একাধিক বিভাগে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে। ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত এক গণশুনানিতে রোগীরা দালাল চক্র, শয্যা বাণিজ্য, নির্দিষ্ট প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী পাঠানো এবং প্যাথলজিতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ তোলেন। সে সময় দুদক কমিশনের এক কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, “এখানে সেবা নিয়ে সন্তুষ্ট এমন রোগী খুঁজে পাওয়া কঠিন।”
যন্ত্রপাতির সংকট ও প্রযুক্তিগত পশ্চাদপদতা
প্যাথলজি বিভাগে আধুনিক অটো অ্যানালাইজার, সিবিসি মেশিন, বায়োকেমিক্যাল অ্যানালাইজারসহ বেশ কিছু যন্ত্র অকার্যকর বা আংশিক সচল বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেক পরীক্ষা ম্যানুয়ালি করতে হচ্ছে, যা সময়সাপেক্ষ এবং ত্রুটির ঝুঁকি বাড়ায়। রেডিওলজি বিভাগেও অনুরূপ সমস্যা রয়েছে বলে জানা গেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি তৃতীয় স্তরের সরকারি হাসপাতালে এ ধরনের যন্ত্রপাতির অচলাবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়।
রোগীদের চরম ভোগান্তি
দৈনন্দিন ভোগান্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে অনেক রোগী বাধ্য হয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে যাচ্ছেন। এতে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে। এক অভিভাবক বলেন, “সরকারি হাসপাতালে সাশ্রয়ী চিকিৎসা পাওয়ার কথা। কিন্তু এখানে সময়মতো টেস্ট না হওয়ায় প্রাইভেট ল্যাবে যেতে হচ্ছে। সেখানে দুই ঘণ্টায় রিপোর্ট পেলেও খরচ অনেক বেশি।”
প্রশাসনের বক্তব্য
হাসপাতালের উপপরিচালক (সম্প্রতি দায়িত্বপ্রাপ্ত) বলেন, “প্যাথলজি বিভাগে কিছু সমস্যা রয়েছে, তবে সেগুলো সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনিয়মের অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যন্ত্রপাতি মেরামত ও নতুন সরঞ্জাম সংযোজনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।” তিনি আরও জানান, টোকেন ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি
স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, খুমেকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সেবা নিশ্চিত করতে হলে কঠোর মনিটরিং, ডিজিটাল টোকেন ও রিপোর্টিং সিস্টেম চালু, অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থা, সিসিটিভি নজরদারি এবং নিয়মিত অডিট প্রয়োজন। পাশাপাশি কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত ও দালাল চক্র নির্মূলে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের দাবি উঠেছে।
রোগী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, শুধুমাত্র সাময়িক অভিযান নয়, স্থায়ী কাঠামোগত সংস্কার দরকার। প্যাথলজি বিভাগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে সাধারণ মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে।