মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:
খেলাধুলার সার্বিক প্রসার ও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে তরুণ সমাজকে সুসংগঠিত করে একটি সুন্দর, সুস্থ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক। তিনি বলেন, তরুণদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। খেলাধুলার মাধ্যমে তরুণদের শৃঙ্খলাবোধ, নেতৃত্বের গুণাবলি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতা তৈরি হয়। তাই দেশের ক্রীড়া খাতকে আরও এগিয়ে নিতে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) দিনাজপুর সরকারি কলেজে আয়োজিত ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আন্তঃকলেজ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা’ (রংপুর বিভাগ)-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার কর্তৃক গৃহীত ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খেলাধুলার উন্নয়ন, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মতো বিভিন্ন দূরদর্শী পদক্ষেপ দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফসল। এসব কর্মসূচির বাস্তবায়ন গত সাত মাসে শুরু হয়েছে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ক্রীড়া খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ক্রীড়াবিদদের পেশাগত স্বীকৃতি ও তাদের সহযোগিতার বিষয়ে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে ৩০০ জন খেলোয়াড়কে ক্রীড়া ভাতা প্রদান করা হয়েছে। চলতি মাসের শেষের মধ্যেই আরও কিছু খেলোয়াড় ও কোচকে এই কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসা হবে। ক্রীড়াবিদদের প্রতিভা বিকাশ ও তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি জানান, ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর প্রথম ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে নির্বাচিত ৩০৬ জন উদীয়মান ও প্রতিভাবান অ্যাথলেট বর্তমানে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) উন্নত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে। তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের জন্য সাফল্য বয়ে আনার মতো ক্রীড়াবিদ তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।
দেশের ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে আমিনুল হক বলেন, সারাদেশে আধুনিক ক্রীড়া অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ‘স্পোর্টস ভিলেজ’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণে মন্ত্রণালয় কাজ করছে। স্থানীয় পর্যায়ে খেলাধুলার প্রসার ঘটানো, তরুণদের মাঠমুখী করা এবং নতুন প্রতিভা অন্বেষণের মাধ্যমে দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে আরও সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দিনাজপুরের ক্রীড়া উন্নয়নের প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে খেলাধুলার প্রসার এবং নতুন প্রতিভা অন্বেষণের জন্য দিনাজপুর বিকেএসপিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে। এর মাধ্যমে দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলের প্রতিভাবান তরুণদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ ও ক্রীড়া সুবিধার সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে।
যুব সমাজের স্বাবলম্বিতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির চিত্র তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অধীনে বর্তমানে ৮৩টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। তরুণদের কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক কাজের জন্য দক্ষ করে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা এবং দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, গত ছয় মাসে ফ্রিল্যান্সিং খাত থেকে ৩৪ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে। তরুণদের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই খাতকে আরও সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে তরুণদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে দেশের কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সরকারের ‘আর্ন’ (EARN) প্রকল্পের কথা তুলে ধরে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ৯ লাখ যুব ও যুব নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। দিনাজপুরের ১০টি উপজেলাতেও প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। এর মাধ্যমে যুবসমাজের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তাদের স্বাবলম্বী করে তোলার উদ্যোগ আরও গতিশীল হবে বলে জানান তিনি।
তরুণ সমাজকে মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তরুণদের যদি নিয়মিত খেলাধুলা ও সুস্থ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা যায়, তাহলে তাদের মধ্যে ইতিবাচক চিন্তাভাবনা ও দায়িত্বশীলতার বিকাশ ঘটবে। খেলাধুলার সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে মাদকমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দল-মত নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে কাজ করলে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। খেলাধুলার সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করে একটি সুন্দর, সুস্থ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তরুণ প্রজন্মের ওপর। তাই তাদের মেধা, প্রতিভা ও কর্মশক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। খেলাধুলার পাশাপাশি প্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তুললে তারা নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. এ এস এম আমানুল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, এমপি।
অনুষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃকলেজ ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়া সংগঠক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনী আয়োজনকে ঘিরে শিক্ষার্থী ও ক্রীড়াবিদদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। খেলাধুলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও প্রতিযোগিতার সুস্থ পরিবেশ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।