এ এম এম আহসান:
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামী সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবে পরিচিত গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী ঢাকার বাইরে বদলি হলেও, সব অভিযোগ উপেক্ষা করে এখনো ঢাকায় বহাল আছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ক্ষমতার দাপটে তিনি একসময় নিজেকেই কার্যত গণপূর্ত অধিদপ্তরের ‘স্বঘোষিত প্রধান প্রকৌশলী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, টেন্ডার, বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্য—এমন বহু গুরুতর অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। পাহাড়সম এসব অভিযোগ সত্ত্বেও দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—কোন অদৃশ্য কারণে তিনি বারবার ছাড় পেয়ে যাচ্ছেন?
সূত্রমতে, পতিত আওয়ামী সরকারের সময়ে আতিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে টেন্ডার বাণিজ্য ও বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। গণপূর্ত বিভাগ–১ এ দায়িত্ব পালনকালে ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন বাংলাদেশ (আইসিবি)-এর বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্পে নিজের সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করে কাজের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন বলে অভিযোগ। মতিঝিল গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও ‘সাইট সিলেকশন’-এর অজুহাতে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারকে প্রভাবিত করে কমিটি গঠন ও প্রকল্প হস্তান্তরের মাধ্যমে কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে অনুমোদিত বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনার বাইরে তিন বছরে প্রায় ৬০ কোটি টাকার অতিরিক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। এলটিএম পদ্ধতির বদলে ওটিএম পদ্ধতিতে শতভাগ দরপত্র আহ্বান করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে—এমন দাবিও করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। ওই সময় তিনি নিজ অফিসের চেয়ে সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর কনফারেন্স কক্ষেই বেশি সময় কাটিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রধান প্রকৌশলীর মিনি কনফারেন্স কক্ষে ঠিকাদারদের নিয়ে টেন্ডার, বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ে দেন–দরবার চলত। অভিযোগ আছে, শেখ পরিবারের কাছে এসব বাণিজ্যের অর্থ ‘কালেকশন’ করে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বেও তিনি যুক্ত ছিলেন। সাবেক মন্ত্রী মোকতাদির চৌধুরীকে প্রভাবিত করে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–১ থেকে শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ–৩ এ পদায়ন নেন বলেও দাবি করা হচ্ছে। শেখ রেহানার সঙ্গে সখ্যতার সুবাদে আমলা ও মন্ত্রীদের ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগও রয়েছে।
এছাড়া, তার স্ত্রী কানিজা মুস্তারিনার নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গড়ে পরোক্ষভাবে গণপূর্ত অধিদপ্তরে কাজ করে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ২০০৮ সালে “Adroit Consultants and Engineers” নামে একটি যৌথ প্রতিষ্ঠানে স্ত্রী কানিজার সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলেও সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার কারণে নথিপত্রে তার নাম গোপন রাখা হয়েছে বলে দাবি সূত্রের।
এ বিষয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তাকে ওএসডি করা ও বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও, গত ৯ ডিসেম্বর আবার তাকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের মূল ভবনেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, যেই ভবনে তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান, সেখানেই তার অবস্থান তদন্তকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে—এটিকে তারা ‘আতিকুল ইসলামের পুনরুত্থান’ হিসেবে দেখছেন।
এ বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী বলেন, “অনেক কাজ আছে যেগুলো সময়ের অভাবে শেষ করা যায় না। আতিক সেগুলো করবেন। এখানে তার ঠিকাদারি বা আর্থিক সম্পৃক্ততা থাকবে না। সরকারের টাকা যেন কেউ ঘরে বসে নিতে না পারে—সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এত অভিযোগ, তদন্ত ও বিতর্কের পরও একজন কর্মকর্তার এমন বহাল থাকা কি শুদ্ধ প্রশাসনের বার্তা দেয়, নাকি গণপূর্তে এখনো প্রভাবশালীদের ছায়াই সবচেয়ে শক্তিশালী?