মোঃ আমির হোসেন:
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র গুলিস্তানে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী হযরত গোলাপ শাহ (রহ.) বাউল একাডেমিকে ঘিরে দুটি পত্রিকায় প্রকাশিত মাদক বিক্রির অভিযোগের প্রতিবাদ জানিয়েছে একাডেমি কর্তৃপক্ষ ও বাউল সমাজ। প্রকাশিত অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
একাডেমি কর্তৃপক্ষের দাবি, সম্প্রতি দুটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে গুলিস্তান ডন প্লাজার পাশে ১০ নম্বর ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত বাউল একাডেমিতে বাউল গানের আসরের আড়ালে মাদক বিক্রি হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা তথ্য প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়নি।
প্রকাশিত সংবাদকে কেন্দ্র করে ঢাকার বাউল, ফকির, শিল্পী ও সংস্কৃতিমনা মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করেছে একাডেমি কর্তৃপক্ষ। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বাউল সংস্কৃতি ও সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসা একটি প্রতিষ্ঠানকে মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া শুধু প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা নয়, বরং বাউল সংস্কৃতির প্রতিও অবমাননাকর।

বাউল গান ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার দাবি
একাডেমি কর্তৃপক্ষ জানায়, এখানে নিয়মিত বাউল গান, দোতারা ও একতারা প্রশিক্ষণ এবং সমাজকল্যাণমূলক বিভিন্ন আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বাউল শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের জন্য এটি একটি সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক চর্চার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বলে তাদের দাবি।
একাডেমির সভাপতি বলেন, “আমরা হযরত গোলাপ শাহ (রহ.)-এর প্রেম ও মানবতার বাণী প্রচার করি। ফকির লালন সাঁই আমাদের শিখিয়েছেন—মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি। আমাদের একাডেমিতে মাদক তো দূরের কথা, ধূমপান পর্যন্ত নিষিদ্ধ। যারা এই মিথ্যা রিপোর্ট করেছে, তারা কোনোদিন আমাদের একাডেমিতে আসেনি। প্রমাণ ছাড়া এমন সংবাদ বাউল সংস্কৃতির প্রতি চরম অবমাননা।”
তিনি আরও বলেন, কোনো অভিযোগ থাকলে তা যাচাই-বাছাই করে সংবাদ প্রকাশ করা উচিত। একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়াও জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

‘বাউল সংস্কৃতি রক্ষার চেষ্টা করছি’
একাডেমির একজন জ্যেষ্ঠ বাউল শিল্পী বলেন, “বাউল গান ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্য। গুলিস্তানের মতো ব্যস্ত এলাকায় আমরা এই সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। একটি কুচক্রী মহল আমাদের উচ্ছেদ করার জন্য এই ষড়যন্ত্র করছে।”
তার দাবি, বাউল গান ও লোকসংস্কৃতির চর্চার জন্য রাজধানীতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। এর মধ্যেও তারা সীমিত পরিসরে নতুন প্রজন্মকে দোতারা, একতারা ও বাউল সংগীতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে মাদকের সঙ্গে যুক্ত করা হলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
‘এলাকায় কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি’
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর কয়েকজনের ভাষ্য, একাডেমিকে ঘিরে তাদের চোখে কোনো ধরনের বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা বা জনদুর্ভোগের ঘটনা ঘটেনি। বরং বিভিন্ন সময় অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো সামাজিক কার্যক্রম এখানে পরিচালিত হয় বলে তারা জানান।
স্থানীয়দের দাবি, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মাদক বিক্রির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা উচিত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগের সত্যতা না থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সুনাম ক্ষুণ্ন হয়—এমন সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্যের দাবি
একাডেমি কর্তৃপক্ষের দাবি, বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা হলে তারা জানান, হযরত গোলাপ শাহ (রহ.) বাউল একাডেমির বিরুদ্ধে মাদক সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ বা মামলা তাদের কাছে নেই।
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লিখিত বক্তব্য বা আনুষ্ঠানিক নথি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা কিংবা অভিযোগ না থাকার বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংবাদ প্রত্যাহার ও তদন্তের দাবি
প্রকাশিত প্রতিবেদনকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে একাডেমি কর্তৃপক্ষ কয়েকটি দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- প্রকাশিত মিথ্যা সংবাদ অবিলম্বে প্রত্যাহার করে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।
- বাউল একাডেমির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
- বিষয়টি বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের নজরে আনা হবে।
- প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঐতিহ্যবাহী এই বাউল একাডেমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
- মাদক সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।
‘মিথ্যা প্রতিবেদনে বাউল সংস্কৃতি বন্ধ করা যাবে না’
একাডেমি কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট বাউল শিল্পীদের বক্তব্য, বাউল সংস্কৃতি বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের দাবি, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকাশ করা উচিত। একই সঙ্গে তারা বাউল গান ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে বিতর্কিত না করে প্রকৃত সাংস্কৃতিক চর্চাকে উৎসাহিত করার আহ্বান জানান।
একাডেমির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “হাজার বছরের বাউল সংস্কৃতি কোনো মিথ্যা রিপোর্ট দিয়ে বন্ধ করা যাবে না।” একই সঙ্গে দেশের বাউল, ফকির, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও বাউলপ্রেমী মানুষকে কথিত ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে প্রকাশিত মাদক বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্রগুলোর বক্তব্য, প্রতিবেদনের উৎস এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক নথি যাচাই করা হলে বিষয়টির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের বাইরে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন একাডেমি সংশ্লিষ্টরা।
হযরত গোলাপ শাহ (রহ.) বাউল একাডেমি
১০ নম্বর বিল্ডিং, দ্বিতীয় তলা, ডন প্লাজার পাশে, গুলিস্তান, ঢাকা।