স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল:
চাঁদাবাজির মামলায় পুলিশের চার্জশিট; জমি দখল ও সন্ত্রাসের অভিযোগও—পরোয়ানা বাস্তবায়নে বন্দর থানা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
বরিশাল নগরীর বন্দর থানাধীন চরকাউয়া ইউনিয়নের কর্ণকাঠী এলাকায় চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে। তারা হলেন—মো. ফেরদৌস লিটন চৌকিদার, মো. রাসেল মাহমুদ চৌকিদার ও মো. বশির আহমেদ শামিম হাওলাদার।
তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি চাঁদা দাবির মামলায় তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে পুলিশ। তালাশ বিডির হাতে থাকা মামলার নথি অনুযায়ী, ওই তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, পরোয়ানা জারি হওয়ার পরও তাদের কর্ণকাঠী এলাকায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্তরা কীভাবে প্রকাশ্যে এলাকায় অবস্থান করছেন এবং তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা কতটুকু?
চাঁদা দাবির অভিযোগে মামলা
পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন ও মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর বন্দর থানায় এফআইআর নং-৭ এবং জিআর নং-১৬১ হিসেবে মামলাটি রুজু হয়। মামলার বাদী মো. শিপন হাওলাদার এজাহারে উল্লেখ করেন, তিনি ও অভিযুক্তরা একই এলাকার বাসিন্দা এবং জমি কেনাবেচার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে শিপন হাওলাদার বাড়ি থেকে বরিশাল যাওয়ার পথে চরআইচা এলাকায় নিজের বাড়ির সামনে পাকা রাস্তায় পৌঁছালে অভিযুক্তরা তার পথরোধ করেন।
এ সময় তাদের হাতে রামদা, লোহার রড ও লাঠিসোঁটা ছিল বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, জমি বিক্রির সূত্র ধরে শিপন হাওলাদারের কাছে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মারধর এবং হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, বাদীর ডাক-চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে অভিযুক্তরা এক সপ্তাহের মধ্যে টাকা না দিলে তাকে হত্যা করে মরদেহ গুম করার হুমকি দিয়ে চলে যায়।
তদন্ত শেষে তিনজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
মামলাটির প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন বন্দর থানার উপপরিদর্শক (নিরস্ত্র) শহিদুল ইসলাম। পরবর্তীতে বদলিজনিত কারণে তদন্তভার হস্তান্তর করা হলে ২০২৪ সালের ২১ ডিসেম্বর পুলিশ কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন ভূঞা মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন, বাদী ও সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ, ঘটনাস্থলের ছবি সংগ্রহ, থানার রেকর্ডপত্র যাচাই এবং আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযানসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
তদন্তে নথিভুক্ত সাক্ষ্য ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বাদীর অভিযোগ প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রতীয়মান হওয়ায় মো. ফেরদৌস লিটন চৌকিদার, মো. রাসেল মাহমুদ চৌকিদার ও মো. বশির আহমেদ শামিম হাওলাদারের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩৪১, ৩৮৫ ও ৩৮৭ ধারায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল অভিযোগপত্র নং-৩০ মূলে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। একই সঙ্গে অজ্ঞাতনামা আরও ৩-৪ জনের বিরুদ্ধে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের মামলার দায় থেকে অব্যাহতির আবেদন করা হয়।
বিএনপির নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর ওই তিন ব্যক্তি নিজেদের বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে পরিচয় দিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক ব্যবসা এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও করেছেন স্থানীয় কয়েকজন।
স্থানীয়দের কেউ কেউ বলেন, রাজনৈতিক দলের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালালে এতে সংশ্লিষ্ট দলের প্রকৃত নেতাকর্মীদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তবে মো. ফেরদৌস লিটন চৌকিদার, মো. রাসেল মাহমুদ চৌকিদার ও মো. বশির আহমেদ শামিম হাওলাদার বিএনপির কোনো সাংগঠনিক পদে রয়েছেন কি না কিংবা দলীয়ভাবে তাদের সঙ্গে বিএনপির আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না অনেকে
তালাশ বিডির পক্ষ থেকে কর্ণকাঠী এলাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে অনেকেই প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে অনীহা প্রকাশ করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা দাবি করেন, অভিযুক্তদের প্রভাব ও ভয়ভীতির কারণে অনেকে তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।
দুই স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, ওই তিন ব্যক্তি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে চলছেন। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
লিটন চৌকিদারের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে মো. ফেরদৌস লিটন চৌকিদারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তালাশ বিডি।
তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে মামলা আছে। ওই মামলায় আদালতে চার্জশিট দাখিল হওয়ার পর আমি আর আদালতে হাজির হইনি। তবে আমি যেকোনো মুহূর্তে আদালতে হাজির হব।”
তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে “সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট” দাবি করেন তিনি।
তবে তালাশ বিডির পক্ষ থেকে স্থানীয়দের বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে লিটন চৌকিদার বলেন, এসব অভিযোগের সঙ্গে তিনি জড়িত নন বলে দাবি করেন।
পরোয়ানা রয়েছে, অভিযানে আসামি ফসকে যাওয়ার দাবি পুলিশের
আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্তরা কীভাবে এলাকায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন—এ বিষয়ে জানতে তালাশ বিডির পক্ষ থেকে বন্দর থানায় একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তথ্য সংগ্রহের সময় থানার সংশ্লিষ্ট কেউ ফোন রিসিভ করেননি।
পরে এ বিষয়ে এসআই ফারুক চৌহালীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমার কাছে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে।”
তিনি আরও বলেন, “বন্দর থানা থেকে ঘটনাস্থল অনেক দূরে হওয়ায় অভিযান পরিচালনার সময় কোনো মাধ্যমে আসামিরা খবর পেয়ে যায়। তারপরও এর মধ্যে আমি অভিযান পরিচালনা করেছি। অল্পের জন্য আসামি ফসকে গেছে। আশা করছি, আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হব।”
পরোয়ানা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
মামলার নথিতে চার্জশিট এবং আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার পরও অভিযুক্তরা এলাকায় প্রকাশ্যে অবস্থান করছেন—স্থানীয়দের এমন অভিযোগ এবং পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযান চালানোর কথা স্বীকার করার ঘটনায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়নের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।