মোঃআনজার শাহ:
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কুমিল্লার বরুড়ায় বর্ণাঢ্য আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। উপজেলা ও পৌর বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থেকে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় থাকার আহ্বান জানিয়েছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি কায়সার আলম সেলিম।
সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, “জিয়ার সৈনিকেরা এক হও, লড়াই করো। ঐক্যবদ্ধ বিএনপিই মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার শক্তি।” তাঁর এই আহ্বানে উপস্থিত নেতাকর্মীরা স্বতঃস্ফূর্ত স্লোগানে সাড়া দেন, যাতে পুরো অনুষ্ঠানস্থল প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
বক্তব্যের শুরুতে কায়সার আলম সেলিম বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি বলেন, শহীদ জিয়াউর রহমানের হাতে গড়ে ওঠা এই দল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র ও জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকার কথা তুলে ধরেন তিনি।
তিনি স্মরণ করেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দিশাহারা জাতিকে সাহস ও দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে তিনি সম্মুখসারির ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে কৃষি, শিল্প, যোগাযোগ ও অর্থনীতির উন্নয়নে বিভিন্ন যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি।
বিএনপি সভাপতি বলেন, কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের উৎপাদন বাড়াতে শহীদ জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। একই সঙ্গে দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও জনশক্তি রপ্তানির পথ সম্প্রসারিত করার উদ্যোগও তিনি নিয়েছিলেন। কায়সার আলম সেলিমের ভাষায়, আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত কোটি কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন, যার সূচনা হয়েছিল তাঁরই হাত ধরে।
শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কথা তুলে ধরে কায়সার আলম সেলিম বলেন, ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সব নাগরিকের অভিন্ন পরিচয়কে তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “একজন পাহাড়ি মানুষ বলেন তিনি বাংলাদেশি, একজন হিন্দু বলেন তিনি বাংলাদেশি, একজন বৌদ্ধ বলেন তিনি বাংলাদেশি, একজন খ্রিস্টান বলেন তিনিও বাংলাদেশি। আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় আমরা বাংলাদেশি।”
দলের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, শহীদ জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি দলকে সুসংগঠিত করেন এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। নয় বছরের নিরলস আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের বিজয় অর্জিত হয়, এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। কায়সার আলম সেলিম বলেন, বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস কেবল একটি দলের ইতিহাস নয়; এটি দেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি, দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির কর্মসংস্থানবিষয়ক সম্পাদক ও কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) আসনের সংসদ সদস্য জাকারিয়া তাহের সুমনের। তবে মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন এবং কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির পূর্বনির্ধারিত সভায় অংশগ্রহণের কারণে তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি বলে জানান কায়সার আলম সেলিম। তিনি জানান, মন্ত্রণালয়ের কাজ শেষে জাকারিয়া তাহের সুমন প্রথমে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভায় অংশ নেবেন, এরপর সভা শেষে বরুড়ায় এসে নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
বক্তব্যের শেষাংশে কায়সার আলম সেলিম দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ঐক্য, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিএনপির প্রকৃত শক্তি তার তৃণমূলের নেতাকর্মীরা, তাই দেশের যেকোনো সংকটে ও মানুষের প্রয়োজনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণের পাশে দাঁড়াতে হবে।
অনুষ্ঠান শেষে দলীয় নেতাকর্মীদের উচ্ছ্বসিত অংশগ্রহণে “জিয়ার সৈনিক, এক হও লড়াই করো” এবং “সুমন ভাই”সহ বিভিন্ন স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা অনুষ্ঠানস্থল।