নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা ও চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন একটি ব্যবস্থাপনা কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় রিকশার নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স, নির্দিষ্ট এলাকায় চলাচল এবং জিপিএসের মাধ্যমে নজরদারির ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের ‘ই-মোবিলিটি ও ব্যাটারি সোয়াপিং সিস্টেম রোল-আউট পরিকল্পনা (ঢাকা শহর)’ শীর্ষক নথিতে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে বলে কালবেলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন হলে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে চারটি করে মোট আটটি জোনে ভাগ করা হবে। প্রতিটি জোনে নির্দিষ্টসংখ্যক রিকশা চলাচল করবে। একটি জোনের নিবন্ধিত রিকশা অন্য জোনে যেতে পারবে না। এভাবে রিকশার চলাচল নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২ হাজার ২৫০ কিলোমিটার এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১ হাজার ১৭০ কিলোমিটার ফিডার সড়ককে রিকশা চলাচলের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। দুই সিটিতে চার লাখ করে মোট আট লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা অনুমোদনের প্রস্তাব রয়েছে। তবে প্রধান সড়কে এসব রিকশা চলাচল করতে পারবে না।
বর্তমানে ঢাকা মহানগরে প্রায় ১৫ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে বলে পরিকল্পনার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব রিকশার নিবন্ধন নেই। রাজধানীর বাইরে রয়েছে আরও প্রায় ৪০ লাখ রিকশা। নথিতে অনিয়ন্ত্রিত রিকশা চলাচলের সঙ্গে যানজট ও দুর্ঘটনা বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
রিকশার জোনভিত্তিক চলাচল নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার করা হবে। অনলাইনে জিপিএস ও জিও-ফেন্সিং ব্যবস্থার মাধ্যমে রিকশার অবস্থান পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি অফলাইনে প্রতিটি জোনের জন্য আলাদা রং এবং নম্বরপ্লেটে বিশেষ কোড ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
নতুন রিকশা হিসেবে বুয়েট অনুমোদিত মডেল ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি পুরোনো রিকশা পরিবর্তন করে নতুন রিকশা দেওয়ার জন্য এক্সচেঞ্জ কর্মসূচি চালুর কথাও বলা হয়েছে। পুরোনো রিকশার মূল্য নতুন গাড়ির দামের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। অবশিষ্ট অর্থ মালিক নিজে অথবা ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে পরিশোধ করতে পারবেন।
পরিকল্পনায় দেশীয় দুই সিটের রিকশার সম্ভাব্য মূল্য ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। পুরোনো রিকশার মূল্য সমন্বয়ের পর নতুন রিকশা কিনতে প্রায় দেড় লাখ থেকে ৩ লাখ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।
নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও কিছু সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ রাখা হতে পারে। প্রতিটি রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল সর্বোচ্চ ১০ বছর করার প্রস্তাব রয়েছে। নির্ধারিত সময় শেষ হলে নিবন্ধন বাতিল করা হবে।
সিটি করপোরেশন এলাকায় দুই সিটের রিকশার জন্য এককালীন ১০ হাজার টাকা নিবন্ধন ফি এবং প্রতিবছর ৩ হাজার টাকা নবায়ন ফি নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
চালকদের জন্যও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী নাগরিকরা জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে ৫০০ টাকা ফি দিয়ে পাঁচ বছরের জন্য চালকের লাইসেন্স নিতে পারবেন। লাইসেন্সধারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
রিকশার ব্যাটারি চার্জিং ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অবৈধ চার্জিং বন্ধে নির্দিষ্ট চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজে ব্যাটারি চার্জের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক ব্যাটারি সোয়াপিং ব্যবস্থাও চালুর প্রস্তাব রয়েছে। এ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ব্যাটারি খুলে দ্রুত চার্জ করা ব্যাটারি বসিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকবে। এতে ব্যাটারি পরিবর্তনে সময় লাগতে পারে মাত্র এক থেকে দেড় মিনিট।
পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, চার লাখ রিকশার জন্য স্টেশনের সক্ষমতা অনুযায়ী ১ হাজার থেকে ৬ হাজার ব্যাটারি সোয়াপিং স্টেশন প্রয়োজন হতে পারে। প্রতিটি স্টেশন স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগ হিসেবে ১ কোটি ২৯ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।
স্টেশন স্থাপনের অর্থায়নে গ্রিন ফান্ড থেকে ৭০ শতাংশ, সরকারি প্রণোদনা থেকে ২০ শতাংশ এবং উদ্যোক্তার নিজস্ব বিনিয়োগ থেকে ১০ শতাংশ অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
গত ১৩ ও ৩০ আগস্ট স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দুটি সভায় রিকশার নিবন্ধন, চলাচলের রুট, চালকের লাইসেন্স, উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ ও চার্জিং ব্যবস্থাপনা নিয়ে এসব প্রস্তাব ও সিদ্ধান্তের কথা নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।