ঢাকা-৪ আসনে মনোনয়ন দৌড়ে বিএনপির দুই নেতা, মাঠে সক্রিয় জামায়াত-এনসিপি

মো: নাবিন আহমেদ:

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজধানীর ঢাকা-৪ আসনেও ভোটের উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। শ্যামপুর ও কদমতলী এলাকায় প্রার্থীরা ইতোমধ্যেই প্রচারণায় ব্যস্ত, ভোটারদের নজর কাড়তে চলছে ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টারের মাধ্যমে তৎপরতা। নির্বাচনি এলাকা এখন প্রার্থীদের ছবিতে ছেয়ে গেছে, আর ভোটাররা নিজের সিদ্ধান্ত নিতে ইতোমধ্যেই স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক, নাগরিক ভোগান্তি নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ এবং অতীতের ত্যাগ ও অবদানের হিসাব-নিকাশ করছেন।

ঢাকা-৪ আসনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে স্থানীয় ভোটারদের মতে, আসনটিতে মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে।

বিএনপির মনোনয়ন প্রতিযোগিতা

বিএনপির মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আ. ন. ম. সাইফুল ইসলাম এবং সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন। রবিন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এবং বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক সালাউদ্দিন আহমেদের ছেলে। শেষ পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করতে দুজনই জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।

বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাইফুল ইসলামের অনুসারীরা মনে করেন, আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে থাকা নেতা হিসেবে তার জনপ্রিয়তা অত্যধিক। অন্যদিকে, রবিনের অনুসারীরা পারিবারিক ঐতিহ্য ও সংগঠনের দায়িত্বশীল পদকে তার প্রার্থিতার মূল শক্তি হিসেবে দেখছেন।

আ. ন. ম. সাইফুল ইসলাম দৈনিক স্বাধীন সংবাদকে বলেন, “গরিব দেশ, সমস্যা অসংখ্য। শিক্ষা, সমাজ, রাজনীতি—সব জায়গায় একনায়কতন্ত্রের ছায়া। মানুষকে মুক্ত করতে হবে, দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়তে হবে। মনোনয়ন পাই বা না পাই, মানবসম্পদ তৈরির কাজ থেকে পিছপা হবো না। তরুণরাই এবার ভোটের ফ্যাক্টর। শেখ হাসিনার পতনে ভূমিকা রাখা এই প্রজন্মই ঠিক করবে জাতি কোন পথে যাবে।”

জামায়াত ও এনসিপি মাঠে

বিএনপির পাশাপাশি ভোটের মাঠে সক্রিয় জামায়াত ও এনসিপি। জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এবং এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের প্রধান সমন্বয়কারী মো. নিজাম উদ্দিন প্রচারণা চালাচ্ছেন।

সৈয়দ জয়নুল আবেদীন জানান, “মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত নিরাপদ সমাজ গড়াই আমাদের প্রথম অঙ্গীকার। ঢাকা-৪ হবে পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ নগর।” নিজাম উদ্দিন বলেন, “ঢাকা-৪ ও নোয়াখালীর একটি আসনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। ঢাকা-৪ আসনের বড় সমস্যা চাঁদাবাজি ও মশার উপদ্রব। নির্বাচিত হলে এই দুই সমস্যার সমাধানই হবে আমার অগ্রাধিকার।”

ভোটারদের প্রত্যাশা

স্থানীয় ভোটারদের মতে, শেষ পর্যন্ত বিএনপির মনোনয়ন যেই পাক না কেন, ভোটের মূল লড়াই হবে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে। ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে এবার হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করছেন অনেক ভোটার।

৫২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি রবিউল ইসলাম দিপু বলেন, “মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিনের পক্ষেই তৃণমূল ঐক্যবদ্ধ। এখানে অন্য কোনো প্রার্থী এলে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে।”
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক রাজু আহমেদ বলেন, “ধানের শীষের ঘাঁটি ঢাকা-৪। কিন্তু বিতর্কিত বা বাইরের মুখ এলে ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নেবে। আন্দোলনের সময় হামলা-মামলায় আ. ন. ম. সাইফুলই আমাদের পাশে ছিলেন।”

৫৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল আজিজ মুন্সী স্বপন মন্তব্য করেন, “এই আসনে নাগরিক দুর্ভোগই এখন মূল ইস্যু। নাগরিক সমস্যা সমাধানে যিনি ভূমিকা রাখতে পারবেন তিনিই ভোটারদের মন জয় করতে পারবেন। বিতর্কিত কাউকে প্রার্থী করলে জনগণ মুখ ফিরিয়ে নেবে।”

নির্বাচনি এলাকা ও ভোটার সংখ্যা

ঢাকা-৪ আসনের সীমানায় পড়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৭, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪, ৫৮, ৫৯, ৬০ ও ৬১ নম্বর ওয়ার্ড। এই আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৪৯। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৫ হাজার ৯৪, নারী ভোটার ১ লাখ ৬৭ হাজার ৯৫৩ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার দুইজন।

নির্বাচনের ইতিহাস

ঢাকা-৪ জাতীয় সংসদের ১৭৬ নম্বর আসন। ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এখানে ১২ বার জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। বিএনপি চারবার, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ অবস্থায় তিনবার এবং জাতীয় পার্টি তিনবার জয়ী হয়েছেন। দুটি নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী।

১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মীর আবুল খায়ের এবং ১৯৭৯ সালে বিএনপির আনোয়ার উদ্দিন শিকদার এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এবং ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী জয়ী হন।

১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির সালাহউদ্দিন আহমেদ জয়ী হন। ১৯৯৬ সালের জুনে জয়ী হন আওয়ামী লীগের হাবিবুর রহমান মোল্লা। ২০০১ সালে পুনরায় বিএনপির সালাউদ্দিন আহমেদ জয়ী হন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট সানজিদা খানম এমপি হন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে জয়ী হন সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা। ২০২৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী আওলাদ হোসেন জয়ী হন, যিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

নাগরিক সমস্যা সমাধানেই ভোটারদের মনোযোগ

ঢাকা-৪ আসনের শ্যামপুর ও কদমতলী রাজধানীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এলাকাবাসী এবার প্রার্থীদের মিষ্টি কথা নয়, বরং কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন। পোস্টার ও ফেস্টুনে চোখ ভরে গেলেও ভোটাররা চায় বাস্তব সমস্যা সমাধান।

স্থানীয় খাল ও রাস্তা অপরিচ্ছন্ন, সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে হাঁটুপানি জমে যায়। ওয়াসার পানি খারাপ হওয়ায় অনেকে বোতলজাত পানি ব্যবহার করছেন। মশার উপদ্রব, দোকানদারদের দখল-চাঁদাবাজি—এসব সমস্যার সমাধানই ভোটারদের প্রধান দাবি।

স্থানীয় চায়ের দোকানি জীবন রায় বলেন, “ওয়াসার পানি খাওয়ার অযোগ্য। রাস্তা ভাঙা, বৃষ্টিতেই হাঁটুপানি জমে। যিনি এমপি হবেন তিনি যেন আগে রাস্তাঘাট ও জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধান করেন।”
ভোটার মাহবুব বলেন, “বৃষ্টি মানেই জলাবদ্ধতা। এবার সুষ্ঠু ভোট হলে অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রার্থীই জিতবে।”

নাগরিক সমস্যার সমাধান এবং কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ এবার ভোটের মূল নির্ণায়ক। তাই ঢাকা-৪ আসনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু দলের লড়াই নয়, ভোটারদের প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রার্থীদের কর্মদক্ষতারও পরীক্ষা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *