তিতাসে নতুন কূপের গ্যাস, জাতীয় গ্রিডে বাড়ছে সরবরাহ

জেলা প্রতিনিধি:

দেশে জ্বালানি সংকটের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্র থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়ছে। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দৈনিক ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। এদিন দুপুরে সরবরাহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

এদিকে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৯ নম্বর কূপ থেকেও শিগগিরই জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি আগামী ছয় মাসের মধ্যে আরও দুটি কূপের গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।

তিতাস গ্যাসক্ষেত্র সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) পরিচালনাধীন এই গ্যাসক্ষেত্রের ২৩টি কূপ বর্তমানে উৎপাদনে রয়েছে। এসব কূপ থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় সঞ্চালন লাইনে সরবরাহ করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস উত্তোলনের ফলে মজুত ও চাপ কমে যাওয়ায় পুরোনো কূপগুলোর উৎপাদন ধীরে ধীরে কমছে।

এই পরিস্থিতিতে সদর উপজেলার সুহিলপুর এলাকায় তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ‘সি’ লোকেশনে নতুন গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে ২০১২ সালে জরিপ চালানো হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালে জরিপ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে নতুন কূপ খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিতাস ২৮ নম্বর কূপের খননকাজ শুরু হয়। প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩ হাজার ৬০১ মিটার গভীরতায় কূপটির খননকাজ শেষ হয় গত ২৭ মে। চীনা প্রতিষ্ঠান সিসিডিসি কূপটির খননকাজ করে। পরে গত ১৯ জুন থেকে পরীক্ষামূলকভাবে কূপটি থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়।

অন্যদিকে, ‘সি’ লোকেশনে তিতাস ২৯ নম্বর কূপের খননকাজও শেষ হয়েছে। বর্তমানে কূপটির অন্যান্য কারিগরি কাজ চলছে। ৩ হাজার ৫২৬ মিটার গভীরতায় খনন করা এই কূপে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে কূপটি থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্যে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

এ ছাড়া একই লোকেশনে তিতাস ৩০ নম্বর কূপের খননকাজ আগামী দেড় মাসের মধ্যে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মিটার গভীরতার এই কূপ খননে প্রায় সাড়ে তিন মাস সময় লাগতে পারে।

অন্যদিকে, সদর উপজেলার নন্দনপুর এলাকায় তিতাস ৩১ নম্বর কূপের খননকাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীরতায় খনন করা হচ্ছে কূপটি। ইতোমধ্যে ৪ হাজার ৯২০ মিটার পর্যন্ত খনন সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি দেশের প্রথম গভীর অনুসন্ধান কূপ।

তিতাস ২৮, ২৯ ও ৩০ নম্বর কূপ খনন প্রকল্পের পরিচালক জসিম উদ্দিন মুন্না বলেন, “২৮ নম্বর কূপ থেকে আপাতত দৈনিক ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। ২৯ নম্বর কূপ থেকে আগামী এক মাসের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে গ্যাস সরবরাহ শুরুর লক্ষ্যে কাজ চলছে। কূপটি ৩ হাজার ৫২৬ মিটার গভীরতায় খনন করা হয়েছে। এতে ভালো গ্যাসের চাপ পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।”

তিতাস ৩১ নম্বর গভীর অনুসন্ধান কূপ খনন প্রকল্পের পরিচালক মাহমুদুল নবাব বলেন, “কূপটি দেশের প্রথম গভীর অনুসন্ধান কূপ হওয়ার পাশাপাশি উচ্চচাপ ও উচ্চতাপ সম্পন্ন। বড় ধরনের কোনো জটিলতা না হলে আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে কূপটি থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।”

বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল জলিল প্রামাণিক বলেন, “আগামী ছয় মাসের মধ্যে তিতাস ২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর কূপ থেকে প্রতিদিন ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট করে মোট ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারব বলে আশা করছি। দেশের মোট চাহিদার তুলনায় এই পরিমাণ বেশি না হলেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে এলএনজি আমদানির ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।”

দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ২৯টি কূপ খনন করা হয়েছে। তিতাস ২৮ নম্বর কূপ থেকে দৈনিক ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের কার্যক্রমও এর অংশ।

তিনি বলেন, দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর এসব উদ্যোগ ২০৩০ সালের মধ্যে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান কমাতে সহায়তা করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *