মোঃ আনজার শাহ:
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার বিজয়পুরে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ লতির পাইকারি বাজার। এই বাজারের লতি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। অথচ যে কৃষকের হাতের পরিশ্রমে এই লতি ফলে, সেই কৃষকই আজ লোকসানের কষাঘাতে জর্জরিত। জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য আর কৃষি উপকরণের চড়া দামে উৎপাদন খরচ বেড়েই চলেছে, কিন্তু বাজারে লতির দাম সেই তুলনায় একেবারেই নগণ্য। ফলে মৌসুম শেষে লাভের মুখ না দেখে হতাশায় ডুবে যাচ্ছেন এই অঞ্চলের শত শত কৃষক।
বিজয়পুরের লতির বাজার — দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশে
কুমিল্লা জেলার বরুড়া উপজেলার ১নং আগানগর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের বিজয়পুরে অবস্থিত এই পাইকারি লতির বাজারটি এখন শুধু স্থানীয় কৃষকদের নয়, গোটা অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সপ্তাহের পাঁচ দিন — মঙ্গলবার ব্যতীত — এই বাজারে কৃষক, পাইকার ও ব্যবসায়ীদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। ভোরের আলো ফোটার আগেই কৃষকরা তাজা লতি মাথায় ও যানবাহনে করে নিয়ে আসেন বাজারে।
পাইকাররা এখান থেকে লতি কিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন বড় বাজারে সরবরাহ করেন। শুধু দেশের মধ্যেই নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে এই লতি আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি হচ্ছে, যা দেশের জন্য মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ তৈরি করছে। এত বড় সম্ভাবনার পণ্যটির উৎপাদনকারী কৃষকরাই কিনা আজ সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত — এটাই এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা।
কৃষকের মুখে লোকসানের করুণ কাহিনি
মাঠপর্যায়ে গিয়ে কথা হয় স্থানীয় কৃষক আবুল হোসেনের সঙ্গে। হতাশামাখা কণ্ঠে তিনি বলেন, “এ বছর আমি ২০ ঘণ্টা জমিতে লতি চাষ করেছি। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করেছি। কিন্তু হিসাব মেলাতে গেলে বুকটা ভেঙে যায়। তেলের দাম এত বেশি যে মেশিন চালিয়ে জমিতে পানি সেচ দিতেই বিশাল অঙ্কের টাকা চলে যায়। বীজ, সার, কীটনাশক, শ্রমিক — সব মিলিয়ে খরচের পাহাড় জমে যায়। অথচ বাজারে লতির দাম একেবারেই কম। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, খরচও উঠছে না।”
শুধু আবুল হোসেন নন, বাজারে আসা প্রায় প্রতিটি কৃষকের মুখে একই কথা। তাঁরা জানান, প্রতি মৌসুমেই একই পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। উৎপাদন খরচ প্রতি বছর বাড়ছে, কিন্তু বিক্রয়মূল্য সেই অনুপাতে বাড়ছে না। মাঝখান থেকে লাভের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ও পাইকারদের হাতে। চাষি পাচ্ছেন কেবল হতাশা আর লোকসান।
রপ্তানি আয় হচ্ছে, কিন্তু কৃষকের ঘরে আসছে না
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বিজয়পুরের এই লতি আন্তর্জাতিক মানের। বিদেশে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দেশের চাহিদা পূরণ করে রপ্তানি হওয়া এই পণ্যটি দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আনছে। কিন্তু সেই আয়ের কোনো সুফল পৌঁছাচ্ছে না যে কৃষকের হাতের পরিশ্রমে এই পণ্য ফলে, তাঁর কাছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় কৃষকরা তাঁদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্বপ্ন আছে, শুধু চাই সরকারের সহায়তা
হতাশার মাঝেও আশার আলো দেখেন কৃষক আবুল হোসেন। তিনি বলেন, “সরকার যদি আমাদের পাশে দাঁড়ায়, কৃষি ঋণ সহজলভ্য করে, সেচের তেলে ভর্তুকি দেয় এবং আমাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে — তাহলে আমরা আরও বেশি লতি উৎপাদন করতে পারব। এতে আমরাও লাভবান হব, দেশের কৃষি উৎপাদনও বাড়বে এবং রপ্তানি আয়ও বৃদ্ধি পাবে। কারণ এই লতির চাহিদা দেশে-বিদেশে দুই জায়গাতেই আছে।”
স্থানীয় কৃষকদের প্রধান দাবিগুলো হলো —
এক. কৃষি উপকরণে সরকারি ভর্তুকি নিশ্চিত করা।
দুই. সেচকাজে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস করা।
তিন. কৃষি কার্ডের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা।
চার. লতির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।
পাঁচ. আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা।
সম্ভাবনার মাটিতে শুধু চাই নীতির আলো
বিজয়পুরের এই লতির বাজার প্রমাণ করে দেয়, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামেও লুকিয়ে আছে বিশ্বমানের কৃষি পণ্য উৎপাদনের অসীম সম্ভাবনা। শুধু প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক সরকারি সহায়তা। কৃষকের চোখে স্বপ্ন আছে, মাটিতে সম্ভাবনা আছে, বিদেশে চাহিদা আছে — শুধু নেই ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা আর রাষ্ট্রের আন্তরিক পদক্ষেপ।
সরকার যদি এই অঞ্চলের কৃষকদের প্রতি সত্যিকারের মনোযোগ দেয় এবং কার্যকর উদ্যোগ নেয়, তাহলে বরুড়ার বিজয়পুর একদিন সারা দেশের কৃষি মানচিত্রে একটি উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে উঠবে — এটাই এই অঞ্চলের কৃষকদের শেষ আশা ও প্রাণের দাবি।