মোঃআনজার শাহ
সাবেক সেনাপ্রধান আজিজের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে এবং ভারতে পলাতক নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগে দুই সেনা কর্মকর্তার গ্রেপতারকে স্বাগত জানিয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. সালাহউদ্দিন খান, পিপিএম। তবে শুধু এই দুজনকে ধরলেই চলবে না, গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ ও সচিবালয়ের ভেতরে এখনো সক্রিয় আওয়ামী লীগের সহযোগীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গত তিন দিন আগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেবাশিষ বড়ুয়া ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী গুলশানা বেগমকে গ্রেপ্তার করে। সালাহউদ্দিন খান এ জন্য ডিবিকে ধন্যবাদ জানান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ওই দুজন সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ এবং ভারতে অবস্থানরত নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে বাংলাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন বলে তথ্য এসেছে। ডিবি আরও তথ্য পাবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এনএসআই ও এসবির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন:
বিএনপির পক্ষ থেকে দেওয়া বক্তব্যে সালাহউদ্দিন বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (এনএসআই) ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইকে খতিয়ে দেখতে হবে, ঢাকা মহানগরে কর্মরত এনএসআই কর্মকর্তাদের মধ্যে কারা গত ১৭ বছরে দিনের ভোট রাতে করা, গুম, খুন ও ক্রসফায়ারের মতো নির্যাতনের সময় অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, সেসব ব্যক্তির অনেকেই এখনো এনএসআইতে কর্মরত।
তিনি এনএসআইয়ের প্রধানের কাছেও এ বিষয়ে জানতে চান এবং একে নিরাপত্তার বড় ঘাটতি হিসেবে অভিহিত করেন। সালাহউদ্দিনের অভিযোগ, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠন কোথাও সভা বা কোনো কর্মসূচির পরিকল্পনা করলে সেই তথ্য আগেভাগে ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। ফাঁসকারীরা তাদের জানিয়ে দিচ্ছে, ‘এখানে করলে ধরা পড়বে, অন্য জায়গায় করো।’
‘কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত আইজি পর্যন্ত’:
সাবেক বিশেষ শাখা (এসবি) প্রধান মনিরুল ইসলামকে নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিএনপির এই নেতা। তাঁর ভাষ্য, মনিরুল ইসলাম গোপনে আওয়ামী লীগপন্থী ছিলেন। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও হাবিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ যারা ১৭ বছর সুবিধা পেয়েছেন, তাদের অনেকে এখনো ঢাকা মহানগরে বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর বক্তব্য, কনস্টেবল থেকে শুরু করে অতিরিক্ত আইজি পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে এমন কর্মকর্তা রয়েছেন।
সালাহউদ্দিন বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের অনেক আসামি বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কিছু নেতার মাধ্যমে বিভিন্ন কোণ থেকে মহানগর ও বিভিন্ন জেলায় ঢুকে পড়েছে। এদের মধ্যে যারা দিনের ভোট রাতে করেছে, এমনকি অন্ধকারে ধরে নিয়ে গিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের হত্যা করেছে, তারাও রয়েছে বলে তাঁর দাবি।
‘ওসিগিরি’ করছেন যাঁরা:
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যেসব কর্মকর্তা মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দিয়ে নেতাকর্মীদের নির্যাতন করেছেন, রিমান্ডে নিয়ে অবৈধভাবে অর্থ আদায় করেছেন, তাঁদের অনেকে এখন বিভিন্ন থানায় ওসির দায়িত্বে আছেন বলে অভিযোগ করেন সালাহউদ্দিন। তিনবার-চারবার-পাঁচবার-ছয়বার করে যে ইন্সপেক্টররা ওসি হয়েছেন, গত ১৭ বছরে তাঁদের ভূমিকা নিখুঁতভাবে যাচাই-বাছাই করার আহ্বান জানান তিনি।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে এই বিএনপি নেতা বলেন, গত ১৭ বছর তিনি বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের মামলা ও তথ্য সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন। ৬৪ জেলা সফর করে প্রতিটি জেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন, কার কী ভূমিকা ছিল তা তাঁর জানা। তাঁর ভাষ্য, যাঁরা এখন নিজেদের ‘বিএনপি পরিবারের’ লোক বলে পরিচয় দিচ্ছেন, তাঁদের অনেকেই এক সময় বিএনপির নেতাকর্মীদের রাতের অন্ধকারে ধরে এনে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে নির্যাতন করেছেন এবং অবৈধভাবে টাকা নিয়েছেন।
ক্রসফায়ারে ২২২৬ জন:
সালাহউদ্দিন বলেন, বিএনপিকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলায় নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এই সময়ে ২ হাজার ২২৬ জনকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে যুবদল, ছাত্রদল ও মূল দলের নেতাকর্মীরা ছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল একজন ছাত্রদল কর্মীকে ক্রসফায়ারে হত্যা করলে পুরো এলাকায় ভীতি ছড়িয়ে পড়বে এবং মানুষ দল থেকে দূরে সরে যাবে। কিন্তু ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ক্রসফায়ার, নির্যাতন ও হত্যা, কোনো উপায়েই তা করতে পারেনি।
তবে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, নির্যাতিত নেতাকর্মীদের অনেকে মামলার আসামি হয়ে এখন নিষ্ক্রিয় এবং অনেকে বিএনপির কাছ থেকে প্রাপ্য মনোযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে এমন কিছু ‘৯০-এর ছাত্রদল নেতা’ হঠাৎ আবির্ভূত হয়েছেন, ১৭ বছরে যাঁদের দেখা যায়নি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৯০ সাল বাদ দিয়ে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত কে কী করেছেন, সেটাই খুঁজে বের করতে হবে। তাঁর সতর্কবার্তা, নাশকতার উদ্দেশ্যে এরা বিএনপির ভেতরে মিশে যাচ্ছে, তাই দলকে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ও সচিবালয়ের প্রসঙ্গ:
সালাহউদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার কথা ভেবেই তিনি এসব কথা বলছেন। এনএসআই, ডিজিএফআই ও সেনাপ্রধানকে তিনি এসব তথ্য নিখুঁতভাবে সংগ্রহের অনুরোধ জানান। এসবিকেও একই অনুরোধ করেন। তিনি জানান, তাঁর কাছে বহু তথ্য আছে এবং দলের সিনিয়র নেতাদের কাছে ইতিমধ্যে কয়েকবার তা জমা দিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস, গ্রেপ্তার হওয়া দুই লেফটেন্যান্ট কর্নেলের সঙ্গে আরও অনেকে জড়িত।
প্রকাশ্যে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ও গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানো নিষিদ্ধ দলের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের কর্মকাণ্ডের ওপর পূর্ণ নজর রাখার আহ্বানও জানান তিনি। পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন চাকরির বাইরে থাকার পর ফিরে এসে আইজিপি অনেকের বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছেন ও তদন্ত করছেন। আওয়ামী লীগ আমলের কর্মকাণ্ড দেখেই বোঝা যাবে, কে কেমন ছিলেন; গুলশান, রমনা বা কুমিল্লার মতো থানায় এমন কেউ ওসি হলে তা মেনে নেওয়া যায় না।
সচিবালয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত অনেক ফ্যাসিস্ট রয়েছে, যারা এখন ‘কলস বদলিয়ে’ বিএনপি সেজেছে। আর যারা বলছে, আগামী ডিসেম্বরে ফিরে আসবে, তাদের উদ্দেশে তাঁর বক্তব্য, আদালত থেকে মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানা জারি হয়েছে, এলে ধরা পড়বে এবং জেলে যেতে হবে। আরও মামলা তদন্তাধীন ও বিচারাধীন রয়েছে। এ কথা বলে জনগণ ও আওয়ামী লীগের কর্মীদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
‘এই বুলি চলবে না’:
কোটি কোটি টাকা লুট করে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে বসে থাকা ব্যক্তিদের উদ্দেশে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘এই বুলি চলবে না।’ তাঁর ভাষ্য, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান মেধা ও বুদ্ধি দিয়ে মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেছেন এবং এসব তথ্য সংগ্রহের জন্য যুবদল, ছাত্রদল, কৃষক দলসহ দলের সব অঙ্গসংগঠনকে মাঠে নামিয়েছেন। ডিসেম্বরেই দেখা যাবে, কে কোথা থেকে আসে।
বিদেশে পলাতকদের ফিরিয়ে আনার দাবি:
সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক আগেই বিদেশে চলে গেছেন উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন বলেন, তিনি জানতেন যে অপকর্ম করেছেন। তাঁকে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। একইভাবে বেনজীর, মনিরুল ও হাবিবকে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি।
তাঁর অভিযোগ, তৎকালীন আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন, ‘আমাদের ভোট নেই, তবে রাতের ভোট আছে।’ এর পুরস্কার হিসেবে তিনি সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন। তাঁকেও দেশে ফিরিয়ে আনতে সালাহউদ্দিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি অনুরোধ জানান।
‘দেশবাসী বিচার চায়’:
বক্তব্যের শেষ অংশে সালাহউদ্দিন বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত শহীদদের মা-বাবা, স্ত্রী, ভাই-বোন এবং গত ১৭ বছরে ক্রসফায়ার ও গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার বিচার চায়। দেশবাসী আর শুনতে চায় না যে আওয়ামী লীগ আবার এ দেশে ফিরে আসবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তৎপর হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া দুই কর্নেলের কাছ থেকে আরও তথ্য নিতে হবে এবং জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তার করতে হবে।
সালাহউদ্দিন খান বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের মামলা ও তথ্য সংরক্ষণ শাখার প্রধান সমন্বয়ক।