দুর্গাপূজার আগে নারিকেলের দামে আগুন, জোড়া ৩০০ টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন বাজারে বেড়েছে নারিকেলের দাম। পূজার অন্যতম অনুষঙ্গ নারিকেলের নাড়ু তৈরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে এর ব্যবহার থাকায় উৎসবের মৌসুমে চাহিদা বেড়েছে। আর এই বাড়তি চাহিদার মধ্যে নারিকেলের দাম কয়েক দফা বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতা ও পূজামণ্ডপের আয়োজকেরা।

বাজারে বর্তমানে এক জোড়া নারিকেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ সেপ্টেম্বরের শুরুতে একই পরিমাণ নারিকেল পাওয়া যেত ১৬০ থেকে ১৮০ টাকায়। গত বছরের একই সময়ে জোড়াপ্রতি দাম ছিল ১৯০ থেকে ২০০ টাকা। ফলে গত বছরের তুলনায় এবার নারিকেল কিনতে ক্রেতাদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

সরেজমিনে বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্রেতা প্রয়োজনের তুলনায় কম নারিকেল কিনছেন। অন্যদিকে, পূজার ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনতে গিয়ে বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে হচ্ছে মন্দির ও পূজামণ্ডপ পরিচালনা কমিটিগুলোকে।

চাহিদা বাড়ায় বাড়তি ব্যয়ের চাপ

রংপুর বিভাগের আট জেলায় চলতি বছর ৫ হাজার ৩৫৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে। ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এ উৎসব। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, প্রতিটি মণ্ডপে গড়ে ৮০ থেকে ১০০টি বা তারও বেশি নারিকেল প্রয়োজন হয়। এর বাইরে পূজা উপলক্ষে অনেক পরিবারও ১০ থেকে ৫০টি পর্যন্ত নারিকেল কেনে।

নারিকেলের নাড়ু তৈরি, পূজার নৈবেদ্য এবং বিভিন্ন ধর্মীয় রীতি পালনে এর ব্যবহার থাকায় দুর্গাপূজার আগে বাজারে চাহিদা বেড়ে যায়। তবে চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে দামও বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের অনেকেই প্রয়োজনীয় পরিমাণ নারিকেল কিনতে পারছেন না।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান এলাকার বাসিন্দা ভবেশ চন্দ্র রায় (৬৫) বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার নারিকেলের দাম অনেক বেশি। তাঁদের পরিবারের ২০টি নারিকেল প্রয়োজন হলেও দাম বেশি হওয়ায় মাত্র ১০টি কিনেছেন তিনি।

ভবেশ চন্দ্র রায়ের ভাষ্য, দুই সপ্তাহ আগেও নারিকেলের দাম তুলনামূলক কম ছিল। দুর্গাপূজায় এর ব্যবহার বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন বলে তাঁর ধারণা।

রংপুরের নজিরের হাট এলাকার অ্যাডভোকেট নিরবালা রায় (৪০) বলেন, নারিকেল কিনতে গিয়ে এবার বাড়তি খরচের মুখে পড়তে হচ্ছে। তাঁর মতে, দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। নারিকেল ছাড়া নাড়ু তৈরি করা যায় না বলে দাম বেশি হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী কিনতে হচ্ছে।

পূজার উপকরণের দাম বাড়ায় উদ্বেগ

শুধু নারিকেল নয়, পূজার অন্যান্য উপকরণের দামও বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ক্রেতারা। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বৈদ্যের বাজার এলাকার কৃষক রজনী মোহন্ত (৬৫) বলেন, বাজারে নারিকেলের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে তাঁর মনে হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য পূজার উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক আয়োজনের খরচও বাড়ছে।

তাঁর মতে, উৎসবের সময় প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম বেড়ে গেলে সাধারণ পরিবার ও মন্দির কমিটি—উভয়কেই বাড়তি ব্যয় বহন করতে হয়। তাই বাজারে সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতির দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

পাইকারি দাম ও পরিবহন খরচ বাড়ার কথা ব্যবসায়ীদের

নারিকেলের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে পাইকারি বাজারে বেশি দামে কেনা এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

কুড়িগ্রামের নাজিমখান হাটের নারিকেল ব্যবসায়ী আজিজুল হক বলেন, তাঁরা ১০০টি নারিকেল ১০ হাজার টাকায় কিনে সর্বোচ্চ ১৪ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন।

অন্যদিকে, বড়বাড়ী হাটের ব্যবসায়ী মোবারক আলী জানান, তাঁদের এলাকায় নারিকেলের উৎপাদন খুবই কম। ফলে দক্ষিণাঞ্চল থেকে নারিকেল আনতে হয়। এবার পরিবহন খরচ বেড়েছে এবং পাইকারি বাজারেও দাম বেশি থাকায় খুচরা পর্যায়ে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রতি জোড়া নারিকেলে তাঁদের ২০ থেকে ২৫ টাকা লাভ হয়। মাঝেমধ্যে পচা নারিকেলও পাওয়া যায়। বেশি দামে কেনার কারণে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

কুড়িগ্রামের যাত্রাপুর হাটের ব্যবসায়ী মিজানুর রহমানও একই ধরনের কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, এলাকায় নারিকেলগাছ কম এবং ফলনও তেমন হয় না। ফলে পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে নারিকেল কিনতে হয়। এর প্রভাব পড়ে খুচরা বাজারে। দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতারাও আগের তুলনায় কম নারিকেল কিনছেন।

তবে পাইকারি মূল্য ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎসবকেন্দ্রিক বাড়তি চাহিদা খুচরা বাজারে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নির্ধারণে বাজারের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি আরও যাচাই করা প্রয়োজন।

মন্দিরের খরচ বেড়েছে ছয় হাজার টাকা

রংপুর নগরীর গুপ্তপাড়া দুর্গামন্দিরের কোষাধ্যক্ষ অশোক সরকার বলেন, এ বছর নারিকেলসহ পূজার বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় আয়োজনের খরচ অনেক বেড়েছে। তাঁদের মন্দিরে প্রতিবছর পূজার জন্য ১২০টি নারিকেল প্রয়োজন হয়। এবার প্রতি জোড়া ৩০০ টাকা দরে নারিকেল কিনতে হয়েছে, যেখানে গত বছর একই পরিমাণ নারিকেলের জোড়া ছিল ২০০ টাকা।

অশোক সরকারের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এবার ১২০টি নারিকেল কিনতে তাঁদের খরচ হয়েছে ১৮ হাজার টাকা। গত বছর একই পরিমাণ নারিকেল কিনতে ব্যয় হয়েছিল ১২ হাজার টাকা। অর্থাৎ শুধু নারিকেল কেনার ক্ষেত্রেই মন্দিরটির অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার টাকা।

তিনি বলেন, বাড়িতে ব্যবহারের জন্য নারিকেলের পরিমাণ কিছুটা কমানো সম্ভব হলেও মন্দিরের পূজার ক্ষেত্রে তা করা যায় না। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের জন্য যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই কিনতে হচ্ছে।

লালমনিরহাট শহরের কালীবাড়ী দুর্গা ও কালীমন্দিরের সভাপতি ও পুরোহিত শঙ্কর চন্দ্র চক্রবর্তী বলেন, দুর্গাপূজায় নির্দিষ্ট পরিমাণ নারিকেল ব্যবহার করতে হয়। দাম বাড়লেও ধর্মীয় রীতিনীতি পালনে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। এ বছর শুধু নারিকেল কেনার ক্ষেত্রেই মণ্ডপপ্রতি বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।

নাড়ুর চাহিদা থাকায় কমছে না কেনাকাটা

কুড়িগ্রাম জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সহসভাপতি শ্যামল ভৌমিক বলেন, দুর্গাপূজায় নারিকেলের নাড়ুর বিশেষ কদর রয়েছে। পূজায় আগত অতিথিরাও নাড়ু খেতে পছন্দ করেন। এ কারণে দাম বেশি হলেও মানুষ সাধ্যমতো নারিকেল কিনছেন।

তিনি আরও বলেন, নারিকেলের পাশাপাশি পূজার অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়ায় মন্দির পরিচালনা কমিটিগুলোকে ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। উৎসবের আয়োজন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনতে গিয়ে তাঁদের বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

বাজার তদারকি জোরদারের দাবি

নারিকেলের দাম বৃদ্ধিতে ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, দুর্গাপূজার বাড়তি চাহিদার সময় বেশি দামে নারিকেল কিনতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা পাইকারি মূল্য ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেও খুচরা পর্যায়ে দাম বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ এবং সরবরাহ পরিস্থিতি যাচাই করা প্রয়োজন।

ক্রেতা ও পূজাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বাজার তদারকি জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, উৎসবের সময় প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

দুর্গাপূজার আনন্দ সবার জন্য স্বস্তিদায়ক রাখতে নারিকেলসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের বাজারে স্বচ্ছতা ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *