দেশে গ্যাস উৎপাদনে বড় ধস জাতীয় গ্রিডে প্রতি বছর কমছে ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি

চার কোম্পানির উৎপাদন কমেছে, এক বছরে মোট উৎপাদন হ্রাস প্রায় ৯ দশমিক ৯ শতাংশ ॥ বাড়ছে এলএনজি আমদানির নির্ভরতা ॥ ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা সরকারের

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। চাহিদার তুলনায় দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের জোগান কমে যাওয়ায় আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা দেশের জ্বালানি খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর জাতীয় গ্রিডে ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস কমে যাচ্ছে। এক বছরের ব্যবধানে দেশের পাঁচটি গ্যাস উৎপাদনকারী কোম্পানির মধ্যে চারটির উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। সব মিলিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমেছে ১ হাজার ৯৩১ মিলিয়ন ঘনমিটার, যা প্রায় ৬৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সমপরিমাণ। এতে দেশের শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা ও আবাসিক খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।

পেট্রোবাংলা সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের পাঁচটি গ্যাস উৎপাদনকারী কোম্পানি সম্মিলিতভাবে ১৯ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস উত্তোলন করেছিল। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৬৬৯ মিলিয়ন ঘনমিটারে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমেছে প্রায় ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন হ্রাসের এ প্রবণতা অব্যাহত থাকায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একদিকে গ্যাসের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুত ও উৎপাদনক্ষমতা কমে আসছে। ফলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানো এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি হয়ে উঠেছে।

দেশের গ্যাস উত্তোলনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে মার্কিন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান শেভরন। জাতীয় গ্রিডে দেশীয় গ্যাস সরবরাহের প্রায় অর্ধেকই আসে এ কোম্পানির উৎপাদিত গ্যাস থেকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদনেও বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শেভরন ১১ হাজার ৩৬৮ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস উত্তোলন করেছিল। পরবর্তী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ১৫ মিলিয়ন ঘনমিটারে। এক বছরে কোম্পানিটির উৎপাদন কমেছে ১ হাজার ৩৫৩ মিলিয়ন ঘনমিটার। বিশেষ করে দেশের অন্যতম বৃহৎ বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে আসায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এ গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫ হাজার ৩১৪ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস উত্তোলন করেছিল। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৪৩ মিলিয়ন ঘনমিটারে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির গ্যাস উত্তোলন কমেছে ৪৭১ মিলিয়ন ঘনমিটার। দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কমে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনক্ষমতা ধরে রাখা এবং নতুন কূপ খননের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে এ ঘাটতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

একই চিত্র দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) ক্ষেত্রেও। রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ হাজার ১৫৫ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৭ মিলিয়ন ঘনমিটারে। ফলে এক বছরে বাপেক্সের উৎপাদন কমেছে ৯৮ মিলিয়ন ঘনমিটার। পাশাপাশি দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ব্রিটিশ কোম্পানি তাল্লোর গ্যাস উত্তোলনও নিম্নমুখী হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৩৬৯ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস উত্তোলন করলেও পরবর্তী অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩০ মিলিয়ন ঘনমিটারে। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির উৎপাদন কমেছে ৩৯ মিলিয়ন ঘনমিটার। ফলে বিদেশি ও রাষ্ট্রায়ত্ত উভয় ধরনের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই গ্যাস উত্তোলন ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ ক্রমেই বাড়ছে।

তবে উৎপাদন হ্রাসের এ পরিস্থিতির মধ্যে ব্যতিক্রম দেখা গেছে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (এসজিএফএল) ক্ষেত্রে। দেশের পাঁচটি গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একমাত্র এ কোম্পানিটির উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ১ হাজার ৩৯২ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস উত্তোলন করেছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪২৪ মিলিয়ন ঘনমিটারে। অর্থাৎ এক বছরে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন বেড়েছে ৩২ মিলিয়ন ঘনমিটার। যদিও এ বৃদ্ধি জাতীয় পর্যায়ে সামগ্রিক উৎপাদন হ্রাসের প্রভাব কাটিয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট নয়। বরং দেশের অধিকাংশ গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কমে যাওয়ার বিষয়টি ভবিষ্যৎ জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে ভাবনার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর প্রাকৃতিক উৎপাদন হ্রাস অন্যতম বড় কারণ। দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন চালু থাকায় অনেক গ্যাসক্ষেত্রের চাপ কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে আসা জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন কূপ খনন, বিদ্যমান কূপের সংস্কার, ওয়ার্কওভার এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত সামগ্রিক উৎপাদন হ্রাসের প্রবণতা ঠেকানো সম্ভব হয়নি। ফলে দেশের নিজস্ব গ্যাসসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে সরকার এলএনজি আমদানির পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ লক্ষ্যে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে রাষ্ট্রায়ত্ত দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বিদেশি কোম্পানিকেও যুক্ত করা হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে এসব কূপ খননের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন কূপ থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস পাওয়া গেলে বিদ্যমান উৎপাদন হ্রাসের চাপ কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করছে নির্ধারিত সময়ে কূপ খনন, অনুসন্ধানের ফলাফল এবং নতুন গ্যাসের মজুত নিশ্চিত হওয়ার ওপর।

অন্যদিকে গ্যাস উৎপাদন হ্রাসের বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানিয়েছেন, প্রতি বছর জাতীয় গ্রিড থেকে ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস কমে যাচ্ছে। উৎপাদন হ্রাসের এ প্রভাব মোকাবিলায় নতুন কূপ খননের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। সরকার ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এবং সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চলছে। এসব কূপ খননের মাধ্যমে গ্যাস পাওয়া গেলে বিদ্যমান সরবরাহ ধরে রাখা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সব মিলিয়ে দেশের গ্যাস উৎপাদনে ধারাবাহিক পতন জ্বালানি খাতের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে। বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ার বিপরীতে নতুন উৎস থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া না গেলে আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়বে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্য ওঠানামা, বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় এবং জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। তাই শুধু আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণ নয়, বরং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন, পুরোনো কূপের উৎপাদনক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং গ্যাসসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই এখন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *