নারী কেলেঙ্কারি, হুমকি ও আর্থিক অনিয়মে অভিযুক্ত চাঁদপুর হোমিওপ্যাথি কলেজের অধ্যক্ষ তামজিদ হোসেন— স্থায়ী বরখাস্তের দাবিতে শিক্ষার্থীরা

মনির হোসেন:

চাঁদপুর হোমিওপ্যাথি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ তামজিদ হোসেন এবং প্রভাষক মঞ্জুর হোসেন (মোহন) এর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, নারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের স্থায়ী অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে কলেজের শিক্ষার্থীরা।

বুধবার (১৪ জানুয়ারি) দুপুরে শাহরাস্তি উপজেলার দোয়াভাঙা বাজার এলাকায় চাঁদপুর হোমিওপ্যাথি কলেজের সামনে সচেতন শিক্ষার্থীরা ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় তারা উভয়ের অপসারণসহ সুষ্ঠু ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন।

শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সূত্রে জানা যায়, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ তামজিদ হোসেন দীর্ঘদিন ধরে কলেজের নারী প্রভাষক ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, কলেজের কোনো নারী শিক্ষক কিংবা নারী শিক্ষার্থীই তার অপকর্ম ও যৌন লালসার প্রস্তাব থেকে রেহাই পাননি। একে একে সবাইকে তার সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়াতে প্রলোভন দেখানো হতো।

পরবর্তীতে ভুক্তভোগী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তামজিদ হোসেনের উত্যক্ত ও হয়রানির একাধিক প্রমাণসহ শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাকে বরখাস্ত করেন।

বরখাস্ত হওয়ার পরও থেমে থাকেননি তামজিদ হোসেন। তিনি কলেজের ৭ জন নারী ও পুরুষ শিক্ষকের বিরুদ্ধে চাঁদপুর আদালতে মানহানি মামলা দায়ের করেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন। মামলা চলাকালীন সময়ে ভুক্তভোগী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে হুমকি-ধামকি দেওয়ার অভিযোগও উঠে আসে। এমনকি আদালতে মুখ না খুলতে চাপ প্রয়োগের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানান তারা।
শিক্ষকরা আরও জানান, মামলা চলমান থাকা অবস্থায় তামজিদ হোসেন দুই দফা শালিস বৈঠকে বসেন—যেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বিষয়টি মেনে নিয়ে তাকে পুনরায় কলেজে ফিরিয়ে নেন। তবে কলেজের প্রভাষকরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, এমন অসৎ চরিত্রের একজন ব্যক্তিকে পুনরায় কলেজে নেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

তারা বলেন, তামজিদ হোসেনের কারণে কলেজের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নারী কেলেঙ্কারির বিষয়টি এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ায় নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ভর্তি হতে আগ্রহীরা এসব অভিযোগের কথা শুনে কলেজে আসতে ভয় পাচ্ছেন। তাছাড়া তামজিদ হোসেনকে বরখাস্ত করার পর তিনি কলেজ থেকে প্রায় ৮২ জন শিক্ষার্থী অন্যত্র একটি কলেজে নিয়ে যান বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে।

শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, একটি প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় তামজিদ হোসেন পুনর্বহালের জন্য জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা বলেন, আজ তিনি আমাদের শিক্ষকদের যৌন হয়রানি করেছেন, আগামীকাল আমরা থাকবো না—তখন নতুন বোনেরা আসবে, তাদের সঙ্গেও একই আচরণ করবেন।

শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, তার বিরুদ্ধে হাতেনাতে সব ধরনের প্রমাণ রয়েছে। নারী কেলেঙ্কারির কারণে সমাজে তিনি তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন। তাদের মতে, তামজিদ হোসেন কলেজের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ফিরিয়ে দিয়ে নিজের দোষ স্বীকার করে সরে দাঁড়ালেই ভালো হয়।

উল্লেখ্য, গত ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে চাঁদপুর হোমিওপ্যাথি কলেজের নারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানির অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় সাবেক শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ তামজিদ হোসেনকে বরখাস্ত করেন।

এ ঘটনায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা একাধিকবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ দেন। সর্বশেষ দুই মাস আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়ে তার স্থায়ী বরখাস্ত ও হুমকি-ধামকির বিচার দাবি করেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আরও জানান,এই কেলেঙ্কারিতে তামজিদ হোসেন একা নন। তার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন প্রভাষক মঞ্জুর হোসেন (মোহন), তামজিদের বাবা ও জেঠা। তারা অভিভাবক পরিচয়ে বিভিন্নভাবে তামজিদকে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেছেন এবং এখনো করে আসছেন বলেও অভিযোগ ওঠে।

এর আগেও একাধিকবার তামজিদ হোসেন ও প্রভাষক মঞ্জুর হোসেন (মোহন) এর স্থায়ী বরখাস্তের দাবিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন ও কর্মসূচি পালন করতে দেখা গেছে। দীর্ঘদিন বিচার না পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা গণমাধ্যমের মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, চাঁদপুর জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হস্তক্ষেপ কামনা করেন এবং তামজিদসহ তার সহযোগীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এদিকে শিক্ষকরা জানান, গত দেড় বছর ধরে তারা সম্মানি পাচ্ছেন না।

বেতন না পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে কলেজ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজিয়া হোসেন জানান, কলেজের বাৎসরিক অডিট রিপোর্ট (২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছর) জমা না দেওয়ায় সম্মানি আটকে আছে। এসব দায়িত্ব মূলত অধ্যক্ষের হলেও বর্তমানে অধ্যক্ষ না থাকায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরও জানান, আপাতত ইউএনও কলেজ কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং একটি এডহক কমিটির অনুমোদনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তালিকা পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন মিললেই সমস্যার সমাধান হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি। তবে, ইতোমধ্যেই কয়েকবারই অধ্যক্ষ তামজিদকে কলেজের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও রেকর্ডসমুহ নিয়ে উপস্থিত হতে চিঠি দিলেও তিনি তার কোনো প্রতি উত্তর দেননি।

বরখাস্তের পর শাহরাস্তি উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ইসহাককে কলেজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি জানান, কমিটি না থাকায় সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না, তবে কলেজটি টিকিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ মোঃ তামজিদ হোসেন বলেন, এখনো এর কোনো সমাধান হয়নি এবং হওয়ার সম্ভাবনাও নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *