নিজস্ব প্রতিবেদক:
একসময় দেশীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র ও অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত নেত্রকোণার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল ক্রমেই মাছশূন্য হয়ে পড়ছে। নদী-নালা, বিল ও হাওরে দিনভর জাল ফেলেও কাঙ্ক্ষিত মাছ পাচ্ছেন না জেলেরা। এতে জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজারো মৎস্যজীবী। লোকসান সামলাতে না পেরে অনেকেই বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী পেশা ছেড়ে অন্য কাজে ঝুঁকছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও মৎস্য খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, হাওরের জলজ প্রতিবেশ ও মৎস্যসম্পদ বর্তমানে অস্তিত্বের সংকটে রয়েছে। গবেষণা সংস্থা বারসিকের সাম্প্রতিক তথ্যেও নেত্রকোণার হাওরাঞ্চলে দেশীয় স্বাদুপানির মাছের প্রজাতি কমে যাওয়ার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ছয় দশক আগে নেত্রকোণার হাওরাঞ্চলে অন্তত ১১৫ প্রজাতির দেশীয় মাছের বিচরণ ছিল। বর্তমানে মাছের বৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। প্রতিবেদনে ২৯ প্রজাতির মাছ পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অবশিষ্ট প্রজাতির মধ্যে অনেকগুলোই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা বিভিন্ন প্রজাতির মোট সংখ্যা ও ঝুঁকির শ্রেণিবিন্যাসের হিসাবের মধ্যে অসংগতি রয়েছে।
নেত্রকোণার মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুড়ী ও কলমাকান্দা উপজেলার হাওরাঞ্চলে ঘুরে জেলেদের দুর্দশার চিত্র দেখা যায়। মদন উপজেলার প্রবীণ জেলে ওয়াহাব মিয়া (৭০) প্রায় ছয় দশক ধরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বর্ষায় হাওরে মাছ ধরা এবং শুকনো মৌসুমে কৃষিশ্রমিক হিসেবে ধান কাটার কাজ করে চলে তাঁর সংসার। তবে বয়সের শেষপ্রান্তে এসে হাওরে মাছের এমন সংকট আগে দেখেননি বলে জানান তিনি। চার সদস্যের পরিবারের খরচ মেটাতে তাঁকে এখন কঠিন সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
ওয়াহাব মিয়ার মতো অন্য জেলেরাও বলছেন, মাছ পাওয়া না গেলেও প্রতিদিন নৌকা চালানো, জ্বালানি তেল কেনা ও জাল মেরামতে খরচ হয়। সারাদিন মাছ ধরেও সেই খরচ ওঠে না। ফলে সঞ্চিত অর্থ হারিয়ে অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। বাধ্য হয়ে কেউ কেউ দিনমজুরি ও কৃষিশ্রমিকের কাজ বেছে নিচ্ছেন।
হাওরে মাছের সংকটের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও। দেশীয় মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। বাজারে দেশীয় মাছের ঘাটতি পূরণে এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা মাছের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এতে জেলেদের পাশাপাশি মাছের ব্যবসা ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের জীবিকাও ঝুঁকিতে পড়েছে।
মৎস্য খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, অপরিকল্পিত ও নির্বিচার মাছ শিকার, প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা মাছ ও পোনা নিধন সংকটের অন্যতম কারণ। চায়না দুয়ারি ও মিহি ফাঁসের জালের পাশাপাশি কারেন্ট জালের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে বড় মাছের সঙ্গে রেণু ও পোনাও ধ্বংস হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিষাক্ত রাসায়নিক, গ্যাস ট্যাবলেট ও বিদ্যুতের শক দিয়ে মাছ শিকারের অভিযোগও রয়েছে। কৃষিজমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার বৃষ্টির পানির সঙ্গে হাওর-বিলে মিশে জলজ পরিবেশের ক্ষতি করছে বলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
স্থানীয় পরিবেশকর্মী অহিদুর রহমানের মতে, প্রজনন মৌসুমে অবৈধ জাল ও ক্ষতিকর পদ্ধতিতে মাছ ধরা বন্ধ করা না গেলে অবশিষ্ট দেশীয় প্রজাতিগুলোও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারি নথিপত্রের বরাতে তিনি জানান, একসময় নেত্রকোণা জেলায় ১৩৫টি হাওর, ৮২৪টি বিল, ১১৫টি নদী ও ৪৩৯টি প্রাকৃতিক খাল ছিল। তবে পলি জমে জলাশয় ভরাট, অবৈধ দখল ও জলাশয় সংকুচিত হওয়ার কারণে মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. হারুন-অর-রশিদ জানান, দেশীয় মাছ ও জলজ প্রাণী সংরক্ষণে হাওরাঞ্চলে পর্যাপ্ত অভয়াশ্রম গড়ে তোলা জরুরি। বর্তমানে মদন ও খালিয়াজুড়ী উপজেলায় সরকারি মাছের অভয়াশ্রম নেই। নতুন অভয়াশ্রম স্থাপনের জন্য ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব ও আবেদন পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অনিয়ন্ত্রিত জালের ব্যবহার বন্ধ এবং মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষায় আইনি নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয় মাছের প্রজনন ও আবাসস্থল সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে হাওরের মৎস্যসম্পদ আরও সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি বহু জেলে পরিবার জীবিকার সংকটে পড়বে।