শিবালয় প্রতিনিধি:
পদ্মা নদীর ভাঙনে তীব্র ঝুঁকিতে পড়েছে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার ৩০ নম্বর কুষ্টিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নদীটি বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর থেকে মাত্র তিন মিটার দূরে চলে আসায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিদ্যালয়ের পাকা ভবনে পাঠদান বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে উপজেলা শিক্ষা অফিস।
আরুয়া ইউনিয়নের মান্দ্রা খোলা গ্রামে ১৯২০ সালে ৩৫ শতাংশ জমির ওপর বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘদিন পদ্মা নদী বিদ্যালয় থেকে বেশ দূরে থাকলেও কয়েক বছরের নদীভাঙনে সেটি এখন বিদ্যালয়ের আঙিনার কাছে চলে এসেছে। বিদ্যালয়ে দুটি ভবনের মধ্যে একটি আধাপাকা টিনশেড এবং অপরটি পাকা। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে নির্মিত পাকা ভবনটিতেই ঝুঁকির কারণে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ১১৮ জন শিক্ষার্থী ও ছয়জন শিক্ষক রয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আরুয়া ইউনিয়নের পদ্মাতীরবর্তী ৩৭টি গ্রামের মধ্যে ইতোমধ্যে ১৪টি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে দৃশ্যমান ২৩টি গ্রামের মধ্যে সাতটি আংশিকভাবে ভাঙনের শিকার। বিদ্যালয়টির পাশাপাশি মান্দ্রা খোলা, কুষ্টিয়া ও জগদিয়া গ্রামের মসজিদ, কবরস্থান, বাজার, রাস্তাঘাট ও বসতবাড়িও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকা রক্ষায় সর্বশেষ ২০২৩ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে নদীতীরে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিল। তবে নদীর পানি কমতে থাকায় সেগুলোর অনেকটাই দেবে গেছে। ফলে নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক দফায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ও স্থানীয় সংসদ সদস্য এলাকা পরিদর্শন করলেও এখনো স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা ইকলাশ উদ্দিন বলেন, ‘এই স্কুলের পাশেই আমার বাড়ি। প্রতিনিয়তই ভয়ের মধ্যে থাকি। কখন যে ভিটেবাড়িটুকুও নদীগর্ভে চলে যায়, সেই আতঙ্কে থাকি। সরকার যদি দ্রুত আমাদের জন্য একটা স্থায়ী ব্যবস্থা করে দিত।’
বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নাসিমা আক্তার বলেন, ‘বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে আমার ছেলে পড়ে। সবসময় আতঙ্কের মধ্যে থাকি, কখন যেন দুর্ঘটনার খবর আসে। সন্তানরাও ভয়ে ভয়ে ক্লাস করে। বিদ্যালয়সহ পুরো এলাকাকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে স্থায়ী বেরিবাঁধ প্রয়োজন।’
ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি সীমা আক্তার বলেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিয়েই ক্লাস করছে। নদীতে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন দেখা দেয়। আগে ফেলা জিও ব্যাগও অনেকটা দেবে গেছে। বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে চলে গেলে শিক্ষার্থীদের অন্যত্র পাঠদানের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই বিদ্যালয় রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ শামিনুর রহমান বলেন, একসময় স্থানীয়দের সহায়তায় বাঁশ-ছন দিয়ে ভাঙন রোধে বাঁধ তৈরি করা হতো। বর্তমানে জিও ব্যাগ ফেলা থাকলেও নদী বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীরের কাছে চলে এসেছে। শিক্ষা অফিস থেকে পাকা ভবনে পাঠদান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়টি রক্ষায় এখনই স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
শিবালয় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মাহফুজা খান ইউসুফজী বলেন, বিদ্যালয়টি অনেক আগে থেকেই ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। তিন বছর আগে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফেলা জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন ঠেকিয়ে রাখা হয়েছিল। নদীতে বড় নৌযান চলাচলের কারণে বড় ঢেউ সৃষ্টি হচ্ছে। ঝুঁকির কারণে একটি ভবনে পাঠদান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, সংসদ সদস্যের ডিও লেটার এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।
মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবির বলেন, বিদ্যালয়টি রক্ষায় তিনি তিনবার এলাকা পরিদর্শন করেছেন। মন্ত্রণালয় থেকে দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলার আশ্বাস দেওয়া হলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ঢাকায় ফিরে মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে চলে গেলে সেটি পুনর্গঠন করা কঠিন হয়ে পড়বে। বিদ্যালয়টি রক্ষায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের দাবির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তিনি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান।