শেষ বিদায়ে ট্রোম্যান, স্বজনদের চোখে অশ্রু

রাঙামাটি প্রতিনিধি:

দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে মারা যাওয়া বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য ট্রোম্যান খীসাকে শেষ বিদায় জানালেন স্বজন, সহকর্মী ও এলাকাবাসী। সোমবার রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নের রামহরি পাড়ায় সামরিক মর্যাদা ও বৌদ্ধধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তাঁর দাহকার্য সম্পন্ন হয়।

প্রিয় মানুষকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। দাহকার্যের সময় ট্রোম্যানের স্ত্রী শ্রেয়া চাকমা বিলাপ করে বলেন, ‘কান্না ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই। নৌবাহিনী যা করছে, অনেক করছে। কিন্তু বাচ্চাদের মানুষ করব কীভাবে জানি না।’

সোমবার দুপুরের দিকে নৌবাহিনীর সদস্যরা লাশবাহী ফ্রিজারভ্যানে করে ট্রোম্যানের মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসেন। পরে মরদেহ রাখা হয় স্থানীয় মহাপুরুম উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে। সেখানে মা-বাবা, স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা শেষবারের মতো তাঁকে দেখেন। তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে গ্রামের মানুষ ও প্রতিবেশীরাও সেখানে উপস্থিত হন।

পারিবারিক ও নৌবাহিনী সূত্রে জানা গেছে, নানিয়ারচরের রামহরি পাড়ার সুবিমল খীসা ও গঙ্গা দেবী চাকমা দম্পতির দুই ছেলের মধ্যে ট্রোম্যান ছিলেন ছোট। ১৯৮৭ সালের ১৩ জুন জন্ম নেওয়া ট্রোম্যান ২০০৬ সালের ১ জুলাই নাবিক হিসেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন। তিনি দুই কন্যাসন্তানের জনক ছিলেন। স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে চট্টগ্রামের নৌবাহিনী কলোনিতে বসবাস করতেন তিনি। তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মা থাকতেন গ্রামের বাড়িতে।

গত বছরের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের আওতায় দক্ষিণ সুদানে যান ট্রোম্যান। চলতি বছরের ডিসেম্বরেই তাঁর দেশে ফেরার কথা ছিল। তবে ২০ সেপ্টেম্বর মিশনে দায়িত্ব পালনকালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে দক্ষিণ সুদানের একটি ভারতীয় ফিল্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

গত রোববার সকালে ট্রোম্যানের মরদেহ ঢাকায় পৌঁছায়। পরে সেখান থেকে তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় রাঙামাটির গ্রামের বাড়িতে।

ট্রোম্যানের চাচি জয়ন্তী চাকমা বলেন, ‘অর্থ দিয়ে তো মানুষের ক্ষতিপূরণ হবে না। আমাদের মানুষটা বেঁচে থাকলে অনেক কিছু দেখতে পেতাম। এই ক্ষতি আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।’

ট্রোম্যানের অকালমৃত্যুর খবরে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নানিয়ারচর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান অমর জীবন চাকমা বলেন, ‘সুদানে মিশনে গিয়ে তাঁর মৃত্যুর খবরে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। ছেলেটি খুব ভালো ছিল।’

বুড়িঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রমোদ খীসা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ট্রোম্যানকে দেখে আসছি। দেশ ও বিশ্বশান্তির জন্য কাজ করতে গিয়ে তাঁর অকালমৃত্যু হয়েছে। তাঁর জন্য আমরা গর্বিত।’

নৌবাহিনীর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নানিয়ারচরে নিজ গ্রামে আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার ও পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে ট্রোম্যান খীসার প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানানো হয়। শেষকৃত্যানুষ্ঠানে নৌবাহিনীর কর্মকর্তা, সামরিক ও বেসামরিক সদস্য, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি, সহকর্মী ও স্বজনেরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠান শেষে ট্রোম্যানের স্ত্রীর হাতে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও জাতিসংঘের পতাকা, ক্যাপ এবং মেডেল তুলে দেওয়া হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *