স্টাফ রিপোর্টার:
সরকারি প্রাণিসম্পদ গবেষণা ও খামার প্রতিষ্ঠানে পশুখাদ্য সরবরাহের দরপত্রকে কেন্দ্র করে সিন্ডিকেটের অভিযোগ এবং ঠিকাদার মোঃ হাফিজুর রহমানের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। গত বছরের মে মাসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে হাফিজুর রহমানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তার, একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দরপত্রে অংশগ্রহণ এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার সুবিধার্থে দরপত্রে বিশেষ শর্ত যুক্ত করার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।
প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই), সাভার, কেন্দ্রীয় গোপ্রজনন ও দুগ্ধ খামার এবং সরকারি ছাগল উন্নয়ন খামারে পশুখাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি চক্র দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে রেখেছিল। প্রতিবেদনে হাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়িক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও আনা হয়। পাশাপাশি তাঁর নামে-বেনামে পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দরপত্রে অংশগ্রহণ এবং প্রায় ২৫টি খাদ্যসামগ্রী একত্র করে একটি লটে দরপত্র আহ্বানের বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নিয়ে অনুসন্ধানে ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। ঠিকাদার হাফিজুর রহমানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিনি ১৬ বছর নয়, প্রায় ২৬ বছর ধরে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দরপত্রে অংশগ্রহণ করে আসছেন। তাঁর দাবি, বিএনপি সরকারের সময়েও তিনি এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন এবং নিয়মিত দরপত্র প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই কাজ পেয়েছেন। ফলে তাঁকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সরকারের ঘনিষ্ঠ বা ফ্যাসিবাদী সিন্ডিকেটের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগকে তিনি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।
একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। আগের প্রতিবেদনে হাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দরপত্রে অংশ নেওয়ার অভিযোগ তোলা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ওই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মালিক পাঁচজন পৃথক ব্যক্তি। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা, পরিচালনা ও পারস্পরিক সংশ্লিষ্টতা যাচাই না করে একই ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে দাবি করাকে তাঁরা অপপ্রচার বলে মনে করছেন।
সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় একই ব্যক্তি বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট একাধিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের বিষয়টি অবশ্যই বিধিবিধানের আলোকে যাচাইযোগ্য। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা, পরিচালনা পর্ষদ, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ এবং দরপত্রে অংশগ্রহণের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। শুধু প্রতিষ্ঠানের মালিকদের নাম আলাদা হলেই তাদের মধ্যে কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্টতা নেই—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। আবার যথাযথ প্রমাণ ছাড়া একাধিক প্রতিষ্ঠানকে একই ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন বলেও চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।
দরপত্রে প্রায় ২৫টি খাদ্যসামগ্রী একত্র করে একটি লট করার বিষয়টিও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিএলআরআই একটি বিশেষায়িত গবেষণাপ্রতিষ্ঠান। এখানে প্রাণী ও পোলট্রির খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট উপাদান, খাদ্যের মান এবং সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা গবেষণার স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ। একাধিক সরবরাহকারীর কাছ থেকে বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহ করলে খাদ্যের নির্ধারিত রেশন বা অনুপাত বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজন বিবেচনায় একাধিক খাদ্য উপাদান একত্র করে লটভিত্তিক দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য।
তবে দরপত্রে লট নির্ধারণ বা বিশেষ শর্ত যুক্ত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি সরকারি ক্রয়বিধি, প্রতিযোগিতার সুযোগ এবং সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শর্তের কারণে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে দরপত্রের নথি, কারিগরি শর্ত, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবং মূল্যায়ন প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এদিকে, আগের প্রতিবেদনের অভিযোগের পর ২০২৫ সালের জুলাই মাসে উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে তদন্ত কমিটির গঠনসংক্রান্ত আদেশ, তদন্ত প্রতিবেদন এবং সুপারিশের অনুলিপি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে তদন্তের ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ ও পর্যালোচনা করা জরুরি।
অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার মোঃ হাফিজুর রহমান বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। নিয়ম মেনেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দরপত্রে অংশগ্রহণ করে আসছি। আমার সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে কেউ অপপ্রচার চালিয়ে থাকতে পারে। আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো মিথ্যা।”
কেন্দ্রীয় গোপ্রজনন ও দুগ্ধ খামার, সাভারের পরিচালক ডা. শহিদুল ইসলামের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে ই-টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সিন্ডিকেট পরিচালনা করা অসম্ভব। তিনি ঠিকাদার হাফিজুর রহমানের কাজেরও প্রশংসা করেন। তবে ই-টেন্ডার ব্যবস্থা থাকলেই অনিয়মের সব ধরনের সম্ভাবনা দূর হয়ে যায়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে দরপত্রের নথি ও বাস্তব প্রক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন।
একই বিষয়ে সরকারি ছাগল উন্নয়ন খামার, সাভারের পরিচালক ডা. জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্যও নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর বক্তব্যের বিস্তারিত উদ্ধৃতি পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, বিএলআরআই সাভারের সাবেক মহাপরিচালক ডা. নজরুল ইসলাম ও ড. নথুরাম সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা জানান, বিএলআরআই একটি গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে নিয়মবহির্ভূত হস্তক্ষেপ বা পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে তাঁদের বক্তব্যের পাশাপাশি দরপত্রসংক্রান্ত নথি ও সংশ্লিষ্ট সময়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করাও প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বিএলআরআইয়ের বর্তমান মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুকের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে পশুখাদ্য সরবরাহে সিন্ডিকেটের অভিযোগ এবং ঠিকাদার হাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা দাবিগুলো নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য রয়েছে। অভিযোগের পক্ষে বা বিপক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য সংশ্লিষ্ট দরপত্রের নথি, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন, প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও কার্যক্রমের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সরকারি অর্থে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানের ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট সবার প্রধান লক্ষ্য।