মোঃআনজার শাহ
এতদিন এই দেশের উন্নয়নের গল্প লেখা হতো শুধু ঢাকাকে ঘিরে। রাজধানীর আলোর নিচে অন্ধকারে পড়ে থাকত দেশের বাকি শহরগুলো। কিন্তু সোমবার ( ১৫ জুন) সেই চিত্র বদলে দেওয়ার শপথ নেওয়া হলো। কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ ও বরিশাল দেশের এই পাঁচটি প্রাণবন্ত শহরের নবগঠিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানদের নিয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দপ্তরে বসল এক ঐতিহাসিক মতবিনিময় সভা। সভায় নেতৃত্ব দিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের এমপি।
এই সভা কোনো সাধারণ বৈঠক নয়। এটি একটি জাতির কাছে একটি সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতির দলিল যেখানে লেখা আছে, এই দেশের প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি শহর এবং প্রতিটি প্রান্ত সমান মনোযোগ ও সমান উন্নয়ন পাওয়ার অধিকার রাখে।
যে পাঁচটি শহর আজ নতুন ভোর দেখল,বাংলাদেশের মানচিত্রে কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ ও বরিশাল এই পাঁচটি শহরের নাম উচ্চারিত হলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল জনগোষ্ঠী, অপার সম্ভাবনা এবং দীর্ঘদিনের অপূর্ণ প্রত্যাশার এক বেদনাময় চিত্র। এই শহরগুলো ভৌগোলিকভাবে ভিন্ন, তাদের সংস্কৃতি আলাদা, তাদের সমস্যাও বিচিত্র। কিন্তু তাদের একটি অভিন্ন কষ্ট ছিল দশকের পর দশক ধরে কেন্দ্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকার নীরব যন্ত্রণা। আজ সেই যন্ত্রণার অবসান ঘটানোর আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো।
সভায় উঠে এলো যে বিষয়গুলো,ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা প্রতিটি পদক্ষেপ হবে হিসাবি ও ফলপ্রসূ
প্রতিটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট, বাস্তবসম্মত ও সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরির বিষয়ে গভীর ও বিস্তারিত আলোচনা হয়। কারণ পরিকল্পনা যদি কাগজেই আটকে থাকে, তাহলে মানুষের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসে না। তাই প্রতিটি সিদ্ধান্তকে মাঠে নামিয়ে আনার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
আধুনিক অবকাঠামো শহরের হাড়গোড় মজবুত করার পরিকল্পনা,পাঁচটি শহরকে আধুনিক অবকাঠামোয় সজ্জিত করতে উন্নত সড়ক নির্মাণ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আলোচনায় আসে। একটি শহরের অবকাঠামো যখন মজবুত হয়, তখন সেই শহরের মানুষের জীবনও সহজ ও সুন্দর হয়ে ওঠে।
টেকসই নগরায়ণ, আগামী প্রজন্মের কথা ভেবে আজকের পরিকল্পনা,
শুধু আজকের চাহিদা নয়, আগামী প্রজন্মের স্বপ্নের কথা মাথায় রেখে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নগরায়ণের রূপরেখা তৈরির বিষয়ে সভায় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে হাত মিলিয়ে নগর গড়ে তোলার নীতিতে সকলে অটল থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।
জনসেবার মানোন্নয়ন, মানুষের দরজায় পৌঁছে দেওয়াই লক্ষ্য,
সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় দ্রুত, স্বচ্ছ ও ঝামেলামুক্ত সেবা পৌঁছে দেওয়াই যে নগর উন্নয়নের মূল প্রাণ, সেই সত্যটি সভায় বারবার উচ্চারিত হয়। কারণ উন্নয়নের সত্যিকারের পরিমাপ হলো একজন সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটানো।
মন্ত্রীর কণ্ঠে ঝরে পড়ল দৃঢ়তার ভাষা,সভায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের এমপি নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানদের উদ্দেশে যে কথাগুলো বললেন, তা ছিল একই সঙ্গে অনুপ্রেরণামূলক এবং সতর্কবার্তায় পূর্ণ। তিনি বলেন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলো যেন কেবল কাগজে-কলমের পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান ও অনুভবযোগ্য পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়। মানুষ এখন আর কথায় বিশ্বাস করে না, তারা কাজ দেখতে চায়।
তিনি আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেন, প্রতিটি সিদ্ধান্ত হতে হবে জনমুখী, প্রতিটি উদ্যোগ হতে হবে স্বচ্ছ এবং প্রতিটি কাজ হতে হবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করে কাজ করতে হবে। এই বিষয়ে কোনো আপোস নেই, কোনো ছাড় নেই।
মন্ত্রী আরও বলেন, কুমিল্লাসহ দেশের প্রতিটি অঞ্চলের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করাই এই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ঢাকামুখী জনস্রোত ও অসহনীয় চাপ কমাতে হলে আঞ্চলিক শহরগুলোকে আরও আকর্ষণীয়, বাসযোগ্য ও সুযোগসমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
বৈষম্যের দেয়াল ভাঙার সময় এসেছে,বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ক্ষত ছিল কেন্দ্রীভূত উন্নয়নের এই অসুস্থ সংস্কৃতি। সব সুযোগ, সব সুবিধা, সব বিনিয়োগ ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কোটি মানুষ যুগের পর যুগ ধরে শুধু বঞ্চিত থেকেছেন। স্বপ্ন দেখেছেন কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পাননি। আজকের এই উদ্যোগ সেই দীর্ঘদিনের বেদনাদায়ক বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে ফেলার একটি সাহসী ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ ও বরিশালের লক্ষ লক্ষ মানুষ এখন নতুন করে স্বপ্ন দেখতে পারছেন। তাঁরা বিশ্বাস করতে পারছেন যে তাঁদের শহরও একদিন হবে পরিকল্পিত, পরিষ্কার, নিরাপদ ও আলোকিত যেখানে জীবন হবে সহজ, সুন্দর ও মর্যাদাপূর্ণ।
এটি একটি যাত্রার শুরু, শেষ নয়,আজকের এই মতবিনিময় সভা একটি সমাপ্তি নয়, এটি একটি শুভ সূচনা। গৃহায়ন মন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আজ থেকে শুরু হলো সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের দীর্ঘ কিন্তু অর্থবহ যাত্রা। আধুনিক, বাসযোগ্য ও পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলার এই অঙ্গীকার যদি সততার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে আগামী প্রজন্ম একটি সম্পূর্ণ নতুন বাংলাদেশ পাবে।
সেই বাংলাদেশে ঢাকা একা আলোকিত থাকবে না আলো জ্বলবে কুমিল্লায়, আলো জ্বলবে রংপুরে, আলো জ্বলবে ময়মনসিংহে, নারায়ণগঞ্জে, বরিশালে। দেশের প্রতিটি শহর হবে মানুষের জন্য, মানবতার জন্য এবং আগামীর জন্য।