স্টাফ রিপোর্টার:
সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি জনস্বার্থ রক্ষার এক অবিচল অঙ্গীকার। সত্য অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই এবং নিরপেক্ষ উপস্থাপন—এই তিন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্মিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একশ্রেণির উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গোষ্ঠী সাংবাদিকদের পেশাগত কার্যক্রমকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে তাঁদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিশেষত কোনো রাজনৈতিক নেতা বা দলীয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে একই ফ্রেমে ছবি থাকলেই সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে একটি নির্দিষ্ট দলের লোক বলে আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
সচিবালয় বিটে কর্মরত বিশিষ্ট কলামিস্ট আবুল হোসেন সাজু বলেন, এটি কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়; বরং সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টির কৌশল। একটি ছবি, একটি মুহূর্ত—প্রসঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হলো, একজন সাংবাদিককে পেশাগত দায়িত্ব পালনের স্বার্থে সমাজের সব স্তরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়। রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি কিংবা সাধারণ মানুষ—সবাই সংবাদসূত্র। সংবাদ সম্মেলন, জনসভা, সভা-সেমিনার বা সামাজিক কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকা সাংবাদিকতার স্বাভাবিক অনুষঙ্গ; এটি কোনো দলীয় সম্পৃক্ততার প্রমাণ নয়।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সহ দপ্তর সচিব মোঃ আনজার শাহ বলেন, “প্রকৃত সাংবাদিক কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পদ নন। সাংবাদিকের একমাত্র পরিচয় তাঁর পেশাগত দায়িত্ববোধ ও নিরপেক্ষতা। মাঠে কাজ করতে গেলে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ছবি থাকা স্বাভাবিক ব্যাপার। একটি ছবি দিয়ে কারও রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণ করা অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের অপপ্রচার কেবল একজন সাংবাদিককে নয়, পুরো গণমাধ্যম কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা। যারা সত্য প্রকাশে নির্ভীক, তাঁদের মনোবল ভেঙে দিতে পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। কিন্তু সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো জনআস্থা। সেই আস্থাকে ক্ষুণ্ন করার যে কোনো প্রচেষ্টা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য অশনিসংকেত।”
মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মীরাই এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রতিদিন নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে তাঁরা তথ্য সংগ্রহ করেন, যাচাই করেন এবং জনগণের সামনে উপস্থাপন করেন। অথচ একটি বিভ্রান্তিকর পোস্ট বা বিকৃত ক্যাপশন মুহূর্তেই তাঁদের দীর্ঘদিনের সুনামকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। এতে ব্যক্তিগত মানহানি যেমন ঘটে, তেমনি গণমাধ্যমের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
মোঃ আনজার শাহ মনে করেন, সাংবাদিককে মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর প্রতিবেদন, তথ্যের সত্যতা ও উপস্থাপনার নিরপেক্ষতা দিয়ে বিচার করতে হবে। “কার সঙ্গে ছবি আছে, সেটি নয়—তিনি কী লিখেছেন, কতটা বস্তুনিষ্ঠ থেকেছেন, সেটিই মূল বিষয়। সাংবাদিকতা কোনো দল বা গোষ্ঠীর প্রচারণার যন্ত্র নয়; এটি জনগণের কণ্ঠস্বর ও সমাজের দর্পণ,”—যোগ করেন তিনি।
প্রথম কুমিল্লার সম্পাদক ও প্রকাশক সুজন মজুমদার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার রোধে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। যাচাই না করে কোনো তথ্য বা ছবি শেয়ার করা যেমন অনৈতিক, তেমনি উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার ছড়ানোও আইন ও নীতিবিরুদ্ধ। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা কেবল সাংবাদিকদের দায়িত্ব নয়; পাঠক, দর্শক ও নাগরিক সমাজেরও সমান দায় রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত সত্যই টিকে থাকে—এই বিশ্বাস থেকেই সাংবাদিকরা কাজ করেন। তাই বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সম্মিলিত অবস্থান নেওয়াই এখন সময়ের দাবি। প্রকৃত সাংবাদিকতার বিকাশ, নিরপেক্ষতার চর্চা এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার মধ্য দিয়েই একটি সুস্থ, শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।