মোঃআনজার শাহ
সরকারের লক্ষ্য কেন্দ্রীভূত নগরায়ণ নয়; বরং বিকেন্দ্রীকৃত ও সুষম নগর এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এ কথা জানিয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেছেন, টেকসই নগরায়ণের লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলার জন্য মাস্টার প্ল্যান তৈরির কাজ চলছে।
রবিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় স্থাপত্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবস ২০২৬ উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর (ইউডিডি) ‘বাংলাদেশে Uniform Spatial Planning System প্রবর্তন’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে।
মন্ত্রী বলেন, বাসস্থান মানে শুধু চার দেয়াল নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিরাপদ পানি, বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন, গণপরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের পরিবেশ।
তিনি বলেন, টেকসই নগরায়ণের লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলার জন্য মাস্টার প্ল্যান তৈরির কাজ চলছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের সব অঞ্চলে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।
মন্ত্রী জানান, ঢাকার চারপাশে সেকেন্ডারি টাউনশিপ গড়ে তোলার পরিকল্পনার পাশাপাশি নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রথমবারের মতো ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। মেট্রোপলিটন শহর থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত এ পরিকল্পনা সম্প্রসারিত করা হবে।
তিনি বলেন, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকার চাপ কমবে এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে দেশের সব অঞ্চলে সমান উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীলতা এবং কৃষি ও পরিবেশ সুরক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে ‘স্থানিক পরিকল্পনা আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইনের আওতায় নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর জাতীয় ও আঞ্চলিক স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি নীতিগত কাঠামো তৈরি করবে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ ওবায়দুর রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর। স্বাগত বক্তব্য দেন নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. মোঃ মাহমুদ আলী। সেমিনারে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, এলজিইডি, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, একাডেমিয়া ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বর্তমানে রাজউক, সিডিএ, কেডিএ, আরডিএ, কক্সডিএ, এলজিইডি, সিটি করপোরেশন ও ইউডিডিসহ বিভিন্ন সংস্থা নিজ নিজ আইনি ভিত্তি ও কার্যপরিধির (ToR) অধীনে স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। একই ধরনের জরিপ পরিচালনা করলেও চূড়ান্ত ফলাফল, জলবায়ু ও দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবিলার কৌশল, ভূমির ব্যবহার, মানচিত্রের স্কেল এবং তথ্যের ফরম্যাটে সংস্থাগুলোর মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। ফলে এসডিজি ট্র্যাকারে পরিকল্পনা-সংক্রান্ত তথ্য সন্নিবেশ জটিল হচ্ছে এবং জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সরকারি কাজের এখতিযারের পুনরাবৃত্তি (Overlapping Mandates) দেখা দিচ্ছে।
এ সংকট নিরসনে নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর ‘Uniform Spatial Planning System’ বা সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনা ব্যবস্থার প্রস্তাব তৈরি করেছে। এটি সব সংস্থার জরিপের ধরন, তথ্যের মান, মানচিত্রের স্কেল, ভূমি ব্যবহারের শ্রেণি ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অভিন্নতা আনবে।
নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর ২০৩৫ সালের মধ্যে জাতীয় ও দেশের সব জেলার জন্য স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্যে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ToR প্রস্তুত, রেট সিডিউল, ইউনিফর্ম প্ল্যানিং স্ট্যান্ডার্ড ও ম্যাপ স্কিম গ্রহণ, প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা নির্ধারণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা সক্ষমতা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়।
১৯৪৯ সালে বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবসের সূচনা করেন আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং প্যারিসের ‘ইন্সটিটিউট অব আরবানিজম’-এর গ্র্যাজুয়েট প্রফেসর কার্লোস মারিয়া দে লা পাওলেরা। পরিবেশবান্ধব নগর উন্নয়নের ধারণা ছড়িয়ে দিতে প্রতি বছর ৮ নভেম্বর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য ‘Great communities are built on planning’।