কামরুল ইসলাম:
চট্টগ্রামের পটিয়ায় নিখোঁজ হওয়ার মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই পাঁচ বছরের শিশু জায়হানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মাথায় হাতুড়ির আঘাতে হত্যার পর তার মরদেহ দুটি বস্তায় ভরে বাড়ির পেছনের একটি পরিত্যক্ত ময়লার স্তূপে গর্ত খুঁড়ে লুকিয়ে রাখা হয়। পরে মুক্তিপণের নাটক সাজাতে শিশুটির পরিবারের উদ্দেশে তিন লাখ টাকা দাবি করে একটি হাতে লেখা চিরকূটও রেখে যায় হত্যাকারীরা। তবে পুলিশের নিবিড় তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
বুধবার দিবাগত রাত প্রায় ৩টার দিকে পটিয়া পৌরসভার দক্ষিণ গোবিন্দারখিল এলাকার একটি পরিত্যক্ত স্থানে গর্ত থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় একই এলাকার প্রতিবেশী সাদিয়া সুলতানা নিহা (১৮), তার বাবা সাইফুদ্দীন ওরফে কালা সাইফু (৩৯) এবং মা শাহনুর আক্তারকে (৩৫) আটক করা হয়েছে।
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক জানান, মরদেহ উদ্ধারের সময় শিশুটির মাথায় আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায়। প্রাথমিক তদন্তে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপারের চাঞ্চল্যকর তথ্য
বৃহস্পতিবার বিকেলে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, গ্রেপ্তার হওয়া নিহা সম্পর্কে শিশুটির প্রতিবেশী ফুফু। মঙ্গলবার দুপুরে জায়হানের সঙ্গে ফুটবল খেলতে খেলতে সে শিশুটিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়।
হত্যার পর মরদেহ দুটি বস্তায় ভরে বাড়ির পেছনের ময়লার স্তূপের নিচে গর্ত করে চাপা দেওয়া হয়। এরপর ঘটনাকে অপহরণ ও মুক্তিপণের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করতে তিন লাখ টাকা দাবির একটি চিরকূট রেখে দেওয়া হয়।
পুলিশ সুপার জানান, বুধবার নিহা, তার বাবা, মা ও ভাইকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে নিহা হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে এবং মরদেহ গোপন করার ঘটনাও বিস্তারিত বর্ণনা দেয়।
চিরকূটের সূত্রেই উদঘাটিত হয় রহস্য
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, শুরুতে ঘটনাটি ছিল প্রায় ‘ক্লু-লেস’। তবে মুক্তিপণের চিরকূটই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে কাজ করে।
তিনি জানান, যে ধরনের লেখার প্যাডে চিরকূটটি লেখা হয়েছিল, একই ধরনের একটি প্যাড এবং চিরকূটের নমুনা নিহার বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। পরে তার হাতের লেখার সঙ্গে চিরকূটের লেখা মিলিয়ে দেখা হলে তা পুরোপুরি এক হওয়ায় সন্দেহ আরও জোরালো হয়।
প্রাথমিকভাবে নিহা দাবি করেছিল, প্রতিবেশী এক ব্যক্তির চাপে পড়ে সে চিরকূটটি লিখেছে। পরে ওই ব্যক্তিকে থানায় এনে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তার সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তখন নিহা নিজেই চিরকূট লেখা এবং শিশুটিকে হত্যার কথা স্বীকার করে।
জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে হত্যার প্রাথমিক ধারণা
ওসি জিয়াউল হক জানান, আটক পরিবারের সঙ্গে নিহত শিশুর পরিবারের দীর্ঘদিনের জমি-সংক্রান্ত বিরোধ ছিল। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, অন্য একজনকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। যদিও প্রকৃত উদ্দেশ্য ও ঘটনার বিস্তারিত কারণ জানতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
মঙ্গলবার নিখোঁজ, রাতে জিডি
নিহত জায়হান পটিয়া পৌরসভার দক্ষিণ গোবিন্দারখিল গ্রামের গ্যারেজ মালিক শাহজাহানের একমাত্র ছেলে।
মঙ্গলবার দুপুরে বাড়ির সামনে খেলতে গিয়ে সে নিখোঁজ হয়। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে পরিবারের সদস্যরা বাসার ভেতরে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির একটি হাতে লেখা চিরকূট পান। সেখানে টাকা না দিলে এবং পুলিশকে জানালে শিশুটিকে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
অনেক খোঁজাখুঁজির পরও ছেলের কোনো সন্ধান না পেয়ে মঙ্গলবার রাতেই পটিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন শিশুটির বাবা শাহজাহান।
তিনি জানান, কে বা কারা কখন চিরকূটটি ঘরের ভেতরে রেখে গেছে, তা তারা বুঝতে পারেননি। তাদের সঙ্গে কারও ব্যক্তিগত শত্রুতাও ছিল না বলে তিনি দাবি করেন।
শোকে স্তব্ধ পুরো এলাকা
বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব দক্ষিণ গোবিন্দারখিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে শিশু জায়হানের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে শত শত মানুষ অংশ নেন। শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সকাল থেকেই তার বাড়িতে ভিড় করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা-মা। স্বজনদের আহাজারিতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ
ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার দুপুরে স্থানীয় বাসিন্দারা হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে পটিয়া থানার সামনে অবস্থান নেন।
এ সময় ওসি জিয়াউল হক বিক্ষোভকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তদন্তের ভিত্তিতে প্রকৃত অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশ কাজ করছে।