স্টাফ রিপোর্টার:
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পশুখাদ্য টেন্ডারকে ঘিরে ‘ফ্যাসিবাদী সিন্ডিকেট’ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, পিপিআর-২০২৫ এর প্রতিযোগিতামূলক নীতিকে পাশ কাটিয়ে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় আধিপত্য বজায় রেখেছে।
দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত হাঁস-মুরগির খামার, গরু ও ছাগল উন্নয়ন কেন্দ্রে চলতি বছরের পশুখাদ্য সরবরাহের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। তবে এসব দরপত্রকে ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে।
একাধিক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেছেন, বিগত প্রায় ১৭ বছর ধরে প্রাণিসম্পদ খাতের পশুখাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সরকার পরিবর্তন হলেও সেই ‘ফ্যাসিবাদী সিন্ডিকেট’ এখনো বহাল রয়েছে বলে দাবি তাদের।
অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের সাবেক এপিএস হিল্টন কুমার সাহার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এ সিন্ডিকেটে রয়েছেন সাভারের ঠিকাদার হাফিজুর রহমান ও ঢাকার মিরপুর এলাকার বিমল কুমার। অভিযোগকারীরা জানান, হিল্টন কুমার সাহা প্রতিবছর একাই প্রায় ২৫ থেকে ২৬ জেলার পশুখাদ্য সরবরাহ কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন। একইভাবে গত ১৭ বছর ধরে হাফিজুর রহমান বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই), সাভারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজ এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। অন্যদিকে বিমল কুমারও একই কায়দায় নিয়মিত সরকারি কাজ পেয়ে আসছেন।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেট ব্যবস্থার কারণে একদিকে সরকারি ক্রয়ে কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে নিম্নমানের পশুখাদ্য সরবরাহের ফলে প্রাণিসম্পদ খাতের বিভিন্ন প্রকল্প হুমকির মুখে পড়ছে।
অভিযোগকারীরা আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে গত বছর বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলেও তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্বশীল কোনো পক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে ‘ম্যানেজ প্রক্রিয়ায়’ আগের মতোই নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছেন সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট সদস্যরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি বছর কেন্দ্রীয় হাঁস প্রজনন খামার, নারায়ণগঞ্জ-এর পশুখাদ্য সরবরাহ দরপত্রে মোট চাহিদাকে দুইটি লটে বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি লট ছোট হওয়ায় সেখানে তুলনামূলক প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকলেও বড় লটটিতে এমন বাস্তব অভিজ্ঞতার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, যাতে কার্যত হিল্টন কুমার সাহা ছাড়া অন্য কোনো ঠিকাদার অংশ নিতে না পারেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে একাধারে এই খামারের কাজ পেয়ে আসছেন হিল্টন কুমার এবং চলতি বছরও তিনিই কাজ পাচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামার, জয়পুরহাট; পাবনা; বগুড়া; রংপুর; সিরাজগঞ্জ; বরিশাল এবং পাহাড়তলী খামারের দরপত্র নিয়েও।
অভিযোগ রয়েছে, এসব দরপত্রে পশুখাদ্যের বিভিন্ন আইটেমের যে স্পেসিফিকেশন নির্ধারণ করা হয়েছে, তা কেবলমাত্র আরিফস্ বাংলাদেশ নামের একটি কোম্পানির উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে মিলে যায়। ফলে যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ওই কোম্পানির চুক্তি রয়েছে, তারাই কেবল টেন্ডারে অংশ নিতে পারছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, “আরিফস্ বাংলাদেশ” শুধুমাত্র হিল্টন কুমারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকেই পণ্য সরবরাহ করে। এ কারণে হিল্টনের নিয়ন্ত্রণাধীন এইচ এন এন্টারপ্রাইজ, অঙ্কিতা এন্টারপ্রাইজ, এফ এম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ও লুৎফা এন্ড সন্স নামের চারটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে দরপত্রে অংশ নেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগকারীরা বলেন, গোপন সমঝোতার কারণে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান “আরিফস্ বাংলাদেশ”-এর পণ্য সংগ্রহ করতে পারে না। ফলে কার্যত প্রতিযোগিতাহীন পরিবেশে এসব কাজ হাতিয়ে নিচ্ছে সিন্ডিকেটটি। আর এতে সহযোগিতা করছেন এখনো বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে বহাল থাকা কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা।
এদিকে গোপ্রজনন ও দুগ্ধ খামার সাভার, বরিশাল, সিলেট, ফরিদপুর, রাজশাহী এবং ছাগল উন্নয়ন খামার বরিশাল, ফরিদপুর ও রাজশাহীর পশুখাদ্য সরবরাহ টেন্ডার নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব টেন্ডারেও এমন স্পেসিফিকেশন দেওয়া হয়েছে, যা নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে মিলে যায়। ফলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।