প্রাণ ফিরবে রাজধানীর লেকে, পয়ঃবর্জ্য প্রবেশের সব পথ বন্ধের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

মোঃআনজার শাহ

 

দূষণের ভারে ক্লান্ত রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, নিকেতন ও ধানমণ্ডির লেকগুলোকে আবার প্রাণবন্ত করে তুলতে সমন্বিত ও গতিশীল উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। লেকের পরিবেশগত ভারসাম্য ফেরাতে পয়ঃবর্জ্য প্রবেশের পথ বন্ধ, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, স্লাজ সরানো এবং ভবনভিত্তিক স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) স্থাপনে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি এসব নির্দেশনা দেন। বৈঠকে লেকগুলোর বর্তমান দূষণচিত্র, দূষণের উৎস, পয়ঃবর্জ্য প্রবেশের পথ এবং সংস্কার ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা:
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, লেকের পানিতে পয়ঃবর্জ্য প্রবেশের সব পথ বন্ধ করতে হবে, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ভবনে এসটিপি স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি লেকের তলদেশে জমে থাকা স্লাজ অপসারণ, পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি স্যানিটেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

দূষণের উৎস চিহ্নিত:
বৈঠকে জানানো হয়, গুলশান লেকে পয়ঃবর্জ্য প্রবেশের ছয়টি প্রাইমারি ও ছয়টি সেকেন্ডারি পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব পথ দিয়েই দূষিত পানি ও পয়ঃবর্জ্য লেকে ঢুকছে। সমস্যা সমাধানে গঠিত কারিগরি কমিটি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করে।
কমিটির সুপারিশে পয়ঃবর্জ্য প্রবেশের পথ বন্ধের পাশাপাশি ভবনভিত্তিক এসটিপি স্থাপন এবং বিদ্যমান স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কের বিস্তারিত জরিপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ছাড়া গুলশান-বনানী এলাকায় শর্তসাপেক্ষে স্যুয়ারেজ বিল আদায় এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে ক্যাচমেন্ট এরিয়া তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়।

অবৈধ সংযোগ বন্ধে সমন্বিত অভিযান:
ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী প্রযোজ্য ভবনগুলোতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসটিপি স্থাপন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আবাসিক ভবন ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পয়ঃনিষ্কাশন লাইন সরাসরি বৃষ্টির পানির ড্রেন বা লেকের সঙ্গে যুক্ত আছে কি না, তা শনাক্ত করার সুপারিশ করা হয়। অবৈধ সংযোগ চিহ্নিত করে বন্ধ করতে ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, লেকে নতুন করে দূষিত পানি প্রবেশ বন্ধ করা না গেলে শুধু পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে লেকের পরিবেশগত ভারসাম্য ফেরানো কঠিন হবে।

বাড়ছে পরিচ্ছন্নতার সক্ষমতা:
লেকের ভাসমান বর্জ্য অপসারণ আরও জোরদার করতে যান্ত্রিক নৌকার সংখ্যা দুটি থেকে বাড়িয়ে ১০টি করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ভাসমান এক্সক্যাভেটরের মাধ্যমে তলদেশের স্লাজ অপসারণ এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াতে এরেটর স্থাপন, দুর্গন্ধ কমাতে জৈবিক ও রাসায়নিক পদ্ধতির সমন্বিত প্রয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি স্যানিটেশন নেটওয়ার্ক নির্মাণের প্রস্তাবও বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়।
রাজউকের পাঁচ বিশেষ টিম মাঠে:
রাজধানীর লেকগুলোর সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা ও সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন এলাকায় ৪২ জন জনবল নিয়ে পাঁচটি বিশেষ টিম ইতোমধ্যে নিয়োজিত করা হয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দূষণের উৎস বন্ধের পাশাপাশি নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, স্লাজ অপসারণ, পানির গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ ও আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে রাজধানীর লেকগুলো ধীরে ধীরে হারানো প্রাণ ফিরে পেতে পারে। নগরজীবনের চাপের মধ্যে এসব জলাধার শুধু সৌন্দর্যের অংশ নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বৈঠকে যাঁরা ছিলেন:
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *