স্টাফ রিপোর্টার:
দেশের বেসরকারি জীবনবীমা খাতের আলোচিত প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলমান আর্থিক সংকট, গ্রাহকদের পরিপক্ব (ম্যাচিউরড) বীমা দাবির অর্থ পরিশোধে বিলম্ব এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগী গ্রাহক, কর্মচারী, বীমা খাতের বিশ্লেষক এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল দ্রুত গ্রাহকদের বকেয়া দাবি পরিশোধ, চলমান তদন্ত নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়, বরং দেশের সামগ্রিক বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য এ ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। তারা বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) যদি কার্যকর, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে বহুদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হাজার গ্রাহক ন্যায়বিচার পাওয়ার পাশাপাশি বীমা শিল্পেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার অসংখ্য গ্রাহক অভিযোগ করেছেন, তাদের বীমা পলিসির মেয়াদ শেষ হলেও বছরের পর বছর ধরে প্রাপ্য অর্থ পাচ্ছেন না। অনেকেই সন্তানের উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা, মেয়ের বিয়ে কিংবা অবসর-পরবর্তী নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত প্রিমিয়াম জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কোম্পানির শাখা অফিসে বারবার যোগাযোগ করেও কাঙ্ক্ষিত অর্থ পাননি বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
অনেক গ্রাহক জানান, একাধিকবার আবেদন, তাগাদা, লিখিত অভিযোগ এবং কোম্পানির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও সন্তোষজনক কোনো সমাধান মেলেনি। কেউ কেউ কয়েক বছর ধরে অপেক্ষা করেও এখনও প্রাপ্য অর্থ হাতে পাননি বলে দাবি করেছেন।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, জীবনবীমা মূলত ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য করা হয়। কিন্তু সময়মতো দাবি পরিশোধ না হওয়ায় অনেক পরিবার এখন আর্থিক সংকটে পড়েছে। কেউ চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে পারছেন না, কেউ আবার সন্তানের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
বিভিন্ন সূত্রে কোম্পানিটির গ্রাহকদের প্রায় ২ হাজার ৮১৫ কোটি টাকার বকেয়া দাবি রয়েছে বলে আলোচনা থাকলেও এ বিষয়ে সর্বশেষ সরকারি তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি। ফলে প্রকৃত বকেয়ার পরিমাণ সম্পর্কে আইডিআরএ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক হালনাগাদ তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত বকেয়া কত, কতজন গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং কোন পর্যায়ে দাবি নিষ্পত্তি হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে গ্রাহকদের মধ্যে স্বচ্ছতা ও আস্থা বাড়বে।
বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সরকারি তথ্য, নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে একাধিক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অফিস ভাড়া, প্রচার-প্রচারণা ও প্রশিক্ষণ ব্যয়ের নামে প্রায় ৩২ কোটি টাকার ভুয়া বিল-ভাউচার দেখানো হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ৮ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির প্রায় ৪৭ কোটি টাকা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া একই সম্পত্তিকে একাধিকবার বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণ, মৃত অথবা মেয়াদোত্তীর্ণ পলিসিকে সক্রিয় দেখিয়ে কমিশন উত্তোলন, সফটওয়্যারে গ্রাহকের প্রিমিয়াম জমা দেখানো হলেও ব্যাংক হিসাবে সেই অর্থের প্রতিফলন না থাকা, আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন এবং ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার মতো অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক জবাব এবং তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল এখনও প্রকাশিত হয়নি। ফলে এসব অভিযোগ বর্তমানে তদন্তাধীন এবং আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে এগুলোকে প্রমাণিত হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) কোম্পানিটির সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ সংরক্ষণ, গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা এবং আর্থিক অনিয়মের প্রকৃত চিত্র উদঘাটনে আইডিআরএ বিভিন্ন প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- কোম্পানির কিছু সম্পত্তি নিলামের উদ্যোগ;
- ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ব্যাংক লেনদেনের ফরেনসিক অডিট;
- আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া;
- কোম্পানির আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সম্পদের অবস্থার মূল্যায়ন।
এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থাও বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কোম্পানির অনেক শাখার কার্যক্রম আগের তুলনায় সীমিত হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও শাখা বন্ধ হয়ে গেছে, আবার কোথাও সীমিত জনবল দিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি করেছেন তারা।
তবে বর্তমানে ঠিক কতটি শাখা চালু রয়েছে, কতটি বন্ধ হয়েছে কিংবা কোন কোন অঞ্চলে কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে—সে বিষয়ে কোম্পানি কিংবা আইডিআরএর পক্ষ থেকে হালনাগাদ আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। গ্রাহকদের মতে, শাখা কার্যক্রম সীমিত হওয়ায় দাবি নিষ্পত্তি, তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ভোগান্তি বেড়েছে। কোম্পানির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
কর্মচারীদের একটি অংশের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকটের কারণে কর্মপরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় কর্মীদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে। তবে এসব বিষয়ে কোম্পানির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বীমা খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট পুরো বীমা শিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তাদের ভাষ্য, বহু মানুষ জীবনবীমাকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করলেও দাবি পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা এবং অনিয়মের অভিযোগ মানুষের মধ্যে অনাস্থা তৈরি করছে। এর ফলে নতুন গ্রাহকও জীবনবীমা গ্রহণে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু তদন্ত করাই যথেষ্ট নয়; বরং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের বৈধ দাবি দ্রুত পরিশোধ, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পুনর্গঠন, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, চলমান তদন্ত দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পেশাদারভাবে সম্পন্ন হওয়া জরুরি। তদন্তে যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে না, তাদের যেন অযথা হয়রানির শিকার হতে না হয়—সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করা গেলে ভবিষ্যতে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও অনিয়ম করার আগে সতর্ক হবে।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের একটাই দাবি—তাদের বৈধ পাওনা দ্রুত পরিশোধ করা হোক। তাদের মতে, বছরের পর বছর অপেক্ষা না করিয়ে আদালতের নির্দেশনা, প্রচলিত আইন এবং আইডিআরএর তত্ত্বাবধানে পর্যায়ক্রমে সব গ্রাহকের দাবি নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। অনেকেই বলেছেন, তারা কোনো বিশেষ সুবিধা চান না; কেবল চুক্তি অনুযায়ী তাদের প্রাপ্য অর্থ ফেরত চান।
বীমা খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জীবনবীমা। মানুষের সঞ্চয়, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে এই খাত সরাসরি জড়িত। ফলে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সকে ঘিরে উদ্ভূত সংকট দ্রুত সমাধান করা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, বরং পুরো বীমা শিল্পের স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের প্রত্যাশা, আইডিআরএ, দুর্নীতি দমন কমিশন, সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থা এবং বিচার বিভাগ নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে। একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশনা, তদন্তের ফলাফল এবং প্রচলিত আইনের আলোকে গ্রাহকদের বৈধ দাবি পর্যায়ক্রমে পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে। সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস, স্বচ্ছ তদন্ত, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধের মাধ্যমে শুধু ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স নয়, দেশের সামগ্রিক বীমা খাতেও মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে।