বরিশাল গির্জা মহল্লায় ‘ঘরোয়া’ হোটেলে তরুণীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল:

বরিশাল নগরীর ব্যস্ততম গির্জা মহল্লায় লেচু শাহ মাজারের বিপরীতে অবস্থিত পরিচিত খাবার হোটেল ‘ঘরোয়া’-তে এক তরুণীকে যৌন হয়রানি ও শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় হোটেলের পরোটা তৈরির কারিগর মো. কাইয়ুম খাঁনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পক্ষ। ঘটনার সময় তরুণীর মা তার সঙ্গে ছিলেন বলে জানা গেছে।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে এ ঘটনা ঘটে বলে ভুক্তভোগী পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

ঘটনাস্থলের আশপাশের কয়েকজন ব্যবসায়ী ও প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই নারী তার মেয়েকে নিয়ে ‘ঘরোয়া’ হোটেলে খাবার খেতে যান। খাবার শেষে মা-মেয়ে ক্যাশ কাউন্টারে বিল পরিশোধ করে বের হওয়ার সময় পাশে থাকা হোটেলের পরোটা তৈরির কারিগর মো. কাইয়ুম খাঁন তরুণীর দিকে ঝুঁকে পড়ে তার বুকে হাত দিয়ে আপত্তিকরভাবে স্পর্শ করেন বলে অভিযোগ।

এ ঘটনায় তরুণী ও তার মা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবাদ ও চিৎকার শুরু করলে হোটেলের অন্যান্য গ্রাহক এবং আশপাশের লোকজন সেখানে জড়ো হন। এতে হোটেলের ভেতরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

পরে হোটেল কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে অভিযুক্ত কর্মচারীর বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেয় বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জানা গেছে।

ঘটনাটি জানার পর তালাশ বিডির পক্ষ থেকে সরেজমিনে অনুসন্ধান চালানো হয়। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে হোটেল ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চাওয়া হয়।

হোটেল ম্যানেজার ঘটনার বিষয়ে অবগত থাকার কথা জানালেও সংশ্লিষ্ট সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ সাংবাদিকদের দেখানো বা সরবরাহ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

সিসিটিভি-নিয়ন্ত্রিত একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এমন গুরুতর অভিযোগের পরও ঘটনার সময়কার ফুটেজ সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন না করায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সময়ের ফুটেজ সংরক্ষিত আছে কি না এবং থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে উপস্থাপন করা হবে কি না—তা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

তালাশ বিডির অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ঘটনার পর অভিযোগে অভিযুক্ত হোটেলকর্মী মো. কাইয়ুম খাঁন বর্তমানে হোটেলে নেই। হোটেল কর্তৃপক্ষও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

অভিযোগের পর অভিযুক্ত কর্মচারীকে হোটেলে পাওয়া না যাওয়া এবং ঘটনার বিষয়ে তাৎক্ষণিক আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো তথ্য প্রকাশ্যে না আসায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

হোটেল ‘ঘরোয়া’-তে খাবার খেতে আসা জামসেদ নামের এক ব্যক্তি বলেন, অভিযোগটি গুরুতর। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর হোটেল কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো এবং অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মচারীকে আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া।

তালাশ বিডির অনুসন্ধানে প্রতিবেদকের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণে, ‘ঘরোয়া’ হোটেলের ক্যাশ কাউন্টারে আনোয়ার খানকে একাধিকবার বসে গ্রাহকদের বিল গ্রহণ করতে দেখা গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্যেও উঠে এসেছে, হোটেলটিতে তার নিয়মিত উপস্থিতি ছিল। এতে হোটেলটির সঙ্গে তার প্রকৃত ভূমিকা ও সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ক্যাশ কাউন্টারে উপস্থিতি বা বিল গ্রহণের বিষয়টি একাই মালিকানা কিংবা অংশীদারত্বের আইনগত প্রমাণ নয়—সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও সরকারি রেকর্ড যাচাই হলেই এ বিষয়ে স্পষ্টতা মিলতে পারে।

এদিকে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আনোয়ার খান যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

তালাশ বিডির অনুসন্ধানে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রত্যক্ষ বক্তব্য ও প্রতিবেদকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণে আনোয়ার খানের ‘ঘরোয়া’ হোটেলে নিয়মিত উপস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে। তবে তার মালিকানা, অংশীদারত্ব কিংবা ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও সরকারি রেকর্ড যাচাই প্রয়োজন।

ঘটনার পর অভিযুক্ত কর্মচারীকে হোটেলে পাওয়া না যাওয়া, সংশ্লিষ্ট সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ সাংবাদিকদের না দেখানো এবং তাৎক্ষণিক আইনগত পদক্ষেপের বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য না থাকায় ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে কি না—এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় এক ব্যবসায়ী।

তবে এ অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত প্রয়োজন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বিবেচনায় না নিয়ে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা হোক। ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ ও প্রয়োজন হলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে পরীক্ষা করা এবং অভিযোগে অভিযুক্ত কাইয়ুমকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তারা।

ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, ঘটনার পর হোটেল কর্তৃপক্ষ তাদের আশ্বস্ত করে জানিয়েছিল—অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে বিচারপ্রক্রিয়ায় তাদের ডাকা হবে।

তবে তালাশ বিডির অনুসন্ধানে হোটেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো আইনগত পদক্ষেপের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। ফলে হোটেল কর্তৃপক্ষের দেওয়া আশ্বাসের বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনার বিষয়ে ‘ঘরোয়া’ হোটেলের মালিক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে তালাশ বিডির সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার মাছুদুর রহমান আসলাম মুঠোফোনে কথা বলেন।

সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি আমি শুনেছি। তবে ঘটনার সময় আমি হোটেলে উপস্থিত ছিলাম না। বর্তমানে কাইয়ুমকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা তার জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে পেয়েছি এবং ঠিকানা জানার চেষ্টা করছি। এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলব।’

একজন তরুণীর সঙ্গে একটি খাবার হোটেলের অভ্যন্তরে এমন গুরুতর আচরণের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ায় তদন্তের দাবি রাখে।

অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ ও পরীক্ষা, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং অভিযোগে অভিযুক্ত মো. কাইয়ুম খাঁনকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

তালাশ বিডির অনুসন্ধানে উঠে আসা প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেই—সিসিটিভি ফুটেজে কী রয়েছে, অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মচারী কোথায় এবং গুরুতর অভিযোগের পর হোটেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *